রেলের জমি বেদখল! সিঙ্গুরের আড়াই গুণ জমি এখন অবৈধদের কবলে, চাঞ্চল্যকর আরটিআই রিপোর্টে

ভারতীয় রেল, যা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত, তা আজ এক গভীর সংকটের মুখে। রেলের নিজস্ব হাজার হাজার একর মূল্যবান জমি এখন বেআইনি দখলদারদের কবলে। সম্প্রতি একটি আরটিআই (RTI) আবেদনের জবাবে রেলওয়ে বোর্ড যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ভারতীয় রেলের প্রায় ১,০৬৮.৫৪ হেক্টর জমি বর্তমানে জবরদখল হয়ে আছে।
পরিসংখ্যানের বিশালতা বুঝতে সাধারণ মানুষের জন্য একটি উদাহরণই যথেষ্ট। সিঙ্গুরে টাটা কারখানার জন্য যে ১ হাজার একর জমি বরাদ্দ ছিল, তার আড়াই গুণেরও বেশি এলাকা জুড়ে বর্তমানে রেলের জমি অবৈধ দখলে রয়েছে। দেশের জনবহুল পরিস্থিতিতে রেলের এই বিপুল সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়া মানে পরিকাঠামোগত আধুনিকীকরণে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হওয়া। রেলওয়ে বোর্ডের ল্যান্ড অ্যান্ড অ্যামেনিটিজ ডিরেক্টরেটের তথ্য অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে এই দখলের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। ২০২০-২১ সালে ৮১০.৩১ হেক্টর জমি দখলমুক্ত থাকলেও, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে তা এক লাফে ১,০৬৮.৫৪ হেক্টরে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, গত পাঁচ বছরে জবরদখল প্রায় ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, অবৈধ দখল উচ্ছেদ করার প্রক্রিয়ার ধীর গতি। গত পাঁচ বছরে যেখানে ১,০৬৮ হেক্টরের বেশি জমি বেদখল তালিকায় রয়েছে, সেখানে রেল প্রশাসন উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে উদ্ধার করতে পেরেছে মাত্র ৯৮.০২ হেক্টর জমি। আইনি জটিলতা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সমীকরণের বেড়াজালে রেলের পক্ষে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই আরটিআই আবেদনে রেলের তথ্য ব্যবস্থাপনার এক বড় সীমাবদ্ধতাও ফুটে উঠেছে। ২৫ বছরের জবরদখলের তথ্য চাওয়া হলেও বোর্ড জানিয়েছে, তাদের কাছে দীর্ঘমেয়াদী কোনও তথ্য সংরক্ষিত নেই। এমনকি কোন রাজ্যে বা কোন জোনে জমি দখলের হার সবচেয়ে বেশি, সেই সুনির্দিষ্ট তথ্যও কেন্দ্রীয় দফতরে নেই। এই তথ্যের অভাব দূরদর্শী নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি তৈরি করেছে।
তবে আশার কথা হলো, উচ্ছেদের মাধ্যমে যে সামান্য জমি উদ্ধার করা হচ্ছে, তা রেলের উন্নয়নের কাজে লাগানো হচ্ছে। উদ্ধারকৃত জমিগুলোতে রেললাইন মাল্টি-ট্র্যাকিং, নতুন প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল এবং মালবাহী টার্মিনাল তৈরির কাজ চলছে। এছাড়া, যে জমিগুলো এখনই অপারেশনের জন্য প্রয়োজন নেই, সেগুলোকে রেল ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা আরএলডিএ-এর কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে, যাতে বাণিজ্যিক ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে রাজস্ব বৃদ্ধি পায়। ভারতের পরিকাঠামো উন্নয়নের গতি সচল রাখতে এবং রেলের আধুনিকীকরণের স্বপ্ন সফল করতে এই জমি বেদখলমুক্ত করা এখন রেল মন্ত্রণালয়ের কাছে সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা।