শতবর্ষে মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন! আসানসোলের মঞ্চে আবারও সাড়া জাগালো ‘রক্তকরবী’

মঞ্চে ফিরল নস্টালজিয়া! আধুনিকতার ভিড়ে পূর্ণাঙ্গ থিয়েটারের জয়গানে কাঁপল আসানসোল
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী সৃষ্টি ‘রক্তকরবী’র শতবর্ষপূর্তির এই বিশেষ বছরে আসানসোলের সাংস্কৃতিক আঙিনায় ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনা। গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে আসানসোল শিল্পাঞ্চলে রক্তকরবীর মঞ্চায়ন এক ঐতিহ্যের নাম। তবে সময়ের স্রোতে গত কয়েক বছর পূর্ণাঙ্গ নাটকের চল প্রায় উঠে গিয়েছিল। অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভাব, ক্রমবর্ধমান খরচ এবং ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে ছোট নাটক বা একাঙ্ক নাটকের ট্রেন্ডে গা ভাসিয়েছিল অধিকাংশ নাট্যদল। সেই প্রথা ভেঙে বার্নপুরের নাট্যদল ‘দিশারী’ এবার মঞ্চস্থ করল পূর্ণাঙ্গ দৈর্ঘ্যের ‘রক্তকরবী’, যা এক প্রকার অসাধ্য সাধনের সমান।
আসানসোলের রবীন্দ্র ভবন এদিন দর্শকমুখর ছিল, যা প্রমাণ করে কালজয়ী থিয়েটারের প্রতি মানুষের টান আজও অটুট। নাটকের প্রয়োগ ও পরিকল্পনায় ছিলেন মুম্বই নিবাসী বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব সম্পদ বসু। তিনি নিজে এই নাটকে বিশু পাগলের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন এবং দিনের পর দিন আসানসোলে থেকে নাটকের খুঁটিনাটি পরিচালনা করেছেন। আলোর কারুকার্য, আবহ সংগীত এবং সুবিশাল মঞ্চসজ্জা নাটকটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। রাজা চরিত্রে তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়, নন্দিনী চরিত্রে সুজাতা ভট্টাচার্য এবং বিশু পাগলের চরিত্রে সম্পদ বসুর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।
এই মঞ্চায়নের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল—গত ৫০ বছরে আসানসোলের মঞ্চে যারা নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তাঁদের সংবর্ধনা প্রদান। তাপসী বন্দ্যোপাধ্যায়, মধুমিতা জমিদার, শর্বরী মুখোপাধ্যায় এবং সুজাতা ভট্টাচার্যের মতো প্রবীণ ও নবীন অভিনেত্রীদের এক মঞ্চে দেখে দর্শকাসনে নস্টালজিয়ার ঢেউ খেলে যায়। সম্পদ বসুকেও তাঁর আজীবন নাট্যচর্চার জন্য বিশেষ সম্মান জানানো হয়।
পরিচালক সম্পদ বসুর কথায়, “রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীর শেষে প্রেম ও ফসলের গানের যে বার্তা, তাকেই আমি শোষিতের বিপ্লব ও বন্দিশালা ভাঙার রূপক হিসেবে মঞ্চে তুলে ধরতে চেয়েছি।” নন্দিনী সুজাতা ভট্টাচার্যের কাছে এটি কেবল একটি নাটক নয়, বরং এক পরম প্রাপ্তি। দিশারীর এই প্রচেষ্টা আসানসোলের অন্য সব নাট্যদলকে আবারও পূর্ণাঙ্গ থিয়েটারে ফিরে আসার সাহস জোগাবে। আধুনিকতার দৌরাত্ম্যে যেখানে পূর্ণাঙ্গ থিয়েটার হারিয়ে যাচ্ছিল, সেখানে রক্তকরবীর এই শতবর্ষী উদযাপন প্রমাণ করল—ভালো নাটকের আবেদন কখনো পুরনো হয় না।