শুভেন্দুর ‘কালী’ হুঙ্কারেই কেল্লাফতে! তারাতলা কাণ্ডে গ্রেফতার প্রাক্তন মেয়রের ‘সুপার-বাবু’ কালীচরণ

বৃহস্পতিবার বিধানসভার ফ্লোর থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর করা এক ভবিষ্যদ্বাণী যেন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সত্যি হলো। মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, “কালীকে তুললেই সব বেরিয়ে যাবে।” আর সেই বার্তার রেশ কাটতে না কাটতেই তারাতলা বিপর্যয়ের তদন্তে নেমে বড়সড় সাফল্য পেল সিট (SIT)। কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের তৎকালীন ওএসডি (OSD) তথা পুরসভার অলিখিত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে বৃহস্পতিবার রাতেই গ্রেফতার করা হয়েছে। তারাতলায় বেআইনি গুদামঘর ভেঙে ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ায় তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি।
বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, তারাতলার ওই বেআইনি বিল্ডিংয়ের অনুমোদনের নথিতে প্রাক্তন মেয়রের সই রয়েছে। তিনি সরাসরি আঙুল তোলেন তৎকালীন মেয়রের ঘনিষ্ঠ মহলের দিকে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, “ক্যামাক স্ট্রিটের নির্দেশে পুরসভায় কালীকে বসানো হয়েছিল। শহরের কোনো বিল্ডিংয়ের অনুমোদন তার অঙ্গুলিহেলন ছাড়া হতো না। কলকাতা জুড়ে যে বিল্ডিং সিন্ডিকেট চলছে, তার মূলে রয়েছে এই কালী।” এই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিটের অভিযানে কালীচরণের গ্রেফতারি জল্পনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কে এই কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়? তাঁর কর্মজীবন অত্যন্ত বর্ণময়। ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় রাজ্যে দ্বিতীয় এবং ডব্লিউবিপিএস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করা কালীচরণ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। কিন্তু সেই মেধা ও প্রশাসনিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক ভিন্ন জগৎ। ২০১৮ সালে ফিরহাদ হাকিম কলকাতা পুরনিগমের মেয়র হওয়ার পর ক্যামাক স্ট্রিটের আশীর্বাদপুষ্ট কালীচরণ ওএসডি হিসেবে যোগ দেন। এরপরই পুরসভার অন্দরে শুরু হয় তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য।
পুরসভার অন্দরের খবর, কালীচরণের দাপট ছিল আকাশছোঁয়া। বিল্ডিংয়ের নকশা পাশ করানো হোক বা বড় কোনো টেন্ডার, তাঁর ইশারা ছাড়া ফাইল নড়ত না। প্রভাবশালী এই আধিকারিকের ভয়ে পুরসভার শীর্ষ আমলা থেকে শুরু করে কাউন্সিলররাও তটস্থ থাকতেন। তৎকালীন মেয়রের সাথে দেখা করার আগে অনেকেরই ‘পাস’ লাগত কালীচরণের কাছ থেকে। তাই তাঁকে পুরসভার ‘সুপার-বাবু’ বা ‘শ্যাডো মেয়র’ বলেও ডাকা হতো।
এখন প্রশ্ন উঠছে, কালীচরণ কি কেবলই একা? নাকি এই দুর্নীতির জাল ক্যামাক স্ট্রিটের আরও উঁচুতলা পর্যন্ত বিস্তৃত? তদন্তকারীদের নজর এখন এইদিকেই। তারাতলা কাণ্ডে ৯ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু যে কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং প্রশাসনিক দুর্নীতি ও পরিকল্পনাহীন অনুমোদনের ফল—তা এই গ্রেফতারির মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হচ্ছে। কালীচরণ বর্তমানে সিটের হেফাজতে থাকায় এখন তদন্তে আর কী কী চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে, সেটাই দেখার বিষয়। রাজ্যজুড়ে সাধারণ মানুষের দাবি একটাই—দোষী সে যেই হোক, শাস্তি পেতেই হবে। এই গ্রেফতারি কি পুরসভার বিল্ডিং সিন্ডিকেটের অশুভ চক্রকে ভাঙতে পারবে? এই উত্তর এখন সময়ের অপেক্ষা।