সাধারণ সর্দি-কাশি হলে আমরা অনেকেই ফার্মাসি থেকে সরাসরি কাশির সিরাপ কিনে ফেলি। কিন্তু এবার সেই অভ্যাসে লাগাম টানল কেন্দ্রীয় সরকার। জনস্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে কাশির সিরাপ বিক্রির নিয়মে বড়সড় পরিবর্তন আনল স্বাস্থ্যমন্ত্রক। এখন থেকে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া আর কোনো ওষুধের দোকান থেকে কাশির সিরাপ কেনা যাবে না। ওষুধের বিক্রয়বিধি সংশোধন করে কাশির সিরাপকে ‘সিডিউল K’ (Schedule K) তালিকা থেকে সরাসরি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র।
দীর্ঘদিন ধরে এই তালিকাভুক্ত ওষুধগুলি প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অবাধে কেনা যেত। কেন্দ্রের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ সিরাপ থেকে শুরু করে সব ধরনের কাশির সিরাপ কেনার ক্ষেত্রেই এবার প্রেসক্রিপশন বাধ্যতামূলক করা হলো। তবে কাশির লজেন্স, ট্যাবলেট বা পিলের ক্ষেত্রে এই নিয়ম আপাতত প্রযোজ্য নয়, সেগুলি আগের মতোই সিডিউল K-তে থাকছে। গত বছর ডিসেম্বর মাসে এই সংক্রান্ত খসড়া নির্দেশিকা প্রকাশের পর, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতামত নিয়ে অবশেষে এই চূড়ান্ত নিয়ম কার্যকর করা হলো।
কেন এই কড়া পদক্ষেপ? মূলত সাম্প্রতিক সময়ে ভেজাল কাশির সিরাপ সেবনের ফলে শিশুদের মৃত্যু ও শারীরিক অসুস্থতার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়াতেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষভাবে মধ্যপ্রদেশের ছিন্দওয়াড়ায় ভেজাল কাশির সিরাপ পান করে অন্তত ২২ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার পর দেশজুড়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। এরপরই বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসে কেন্দ্রীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। গত বছরের নভেম্বর মাসে ড্রাগ কনসালটেটিভ কমিটির (DCC) জরুরি বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা সর্বসম্মতিক্রমে মত দেন যে, জনস্বার্থ রক্ষায় সিরাপ বিক্রিতে আর কোনোভাবেই শিথিলতা রাখা উচিত নয়।
তদন্তে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। মধ্যপ্রদেশের ওই ঘটনায় দায়ী সিরাপটি তামিলনাড়ুর একটি সংস্থার তৈরি ছিল। সরকারি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার পর দেখা যায়, ওই সিরাপে ডাইইথিলিন গ্লাইকোল (DEG) নামক অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিকের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৮.৬ শতাংশ। অথচ আন্তর্জাতিক বা জাতীয় মানদণ্ড অনুযায়ী, ওষুধে এই উপাদানের সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রা মাত্র ০.১ শতাংশ। বিষাক্ত উপাদানের এই অস্বাভাবিক উপস্থিতিই শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ বলে চিহ্নিত হয়েছে। ভারতের বাইরেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভেজাল কাশির সিরাপের প্রভাবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যা ভারতের ওষুধের গুণমান নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশ্ন তুলেছিল।
চিকিৎসকদের মতে, প্রেসক্রিপশন বাধ্যতামূলক করার ফলে শিশুদের শরীরে অনুপযুক্ত ও ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহারের ঝুঁকি অনেক কমে যাবে। এখন থেকে কোনো ওষুধের দোকানদার প্রেসক্রিপশন ছাড়া সিরাপ বিক্রি করলে তা বেআইনি বলে গণ্য হবে। কেন্দ্রের এই পদক্ষেপের ফলে ভবিষ্যতে ওষুধের অপব্যবহার ও অসাধু ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থার দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।





