জুনের শুরুতে আশার আলো দেখিয়েও আচমকাই যেন ছন্দপতন ঘটল দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর গতিপথে। দেশের বিস্তীর্ণ অংশে বর্ষার অগ্রগতি বর্তমানে থমকে যাওয়ায় দেশজুড়ে বৃষ্টির ঘাটতি উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আবহবিদদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর সক্রিয়তা এবং বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে অনুকুল পরিস্থিতির অভাবে বর্ষা তার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়েছে।
ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৪ জুন থেকে ১৫ জুনের মধ্যে ভারতে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হওয়া উচিত ছিল ৫৩.৭ মিলিমিটার, কিন্তু বাস্তবে রেকর্ড করা হয়েছে মাত্র ১৯.২ মিলিমিটার। অর্থাৎ, এই অল্প সময়ে বৃষ্টির ঘাটতি প্রায় ৬৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এই দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া দেশের কৃষি এবং জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে দেশের পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে। বর্ষার আগমনের স্বাভাবিক সময় পেরিয়ে গেলেও মুম্বইয়ে এখনও বৃষ্টির দেখা নেই। সাধারণত ৯ থেকে ১১ জুনের মধ্যেই মুম্বইয়ে বর্ষা প্রবেশ করে, কিন্তু এ বছর জুন মাসের দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার পরেও শহরটি বৃষ্টির অপেক্ষায়। আবহবিদদের পূর্বাভাস, মহারাষ্ট্র ও গুজরাতের বিভিন্ন অংশে বর্ষার অগ্রগতির জন্য আরও চার থেকে পাঁচ দিন অপেক্ষা করতে হতে পারে। যদিও ২০ জুনের পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে, তবে রাজ্যজুড়ে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টির জন্য জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
দেশের সামগ্রিক বৃষ্টির চিত্রটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। ৭২৩টি জেলার তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র ১০৩টি জেলায় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়েছে। অন্যদিকে, ২৩৬টি জেলায় বৃষ্টির ঘাটতি স্পষ্ট এবং ২০২টি জেলার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক—সেখানে বৃষ্টির অভাব অত্যন্ত প্রকট। মুম্বইয়ের পরিস্থিতি গত ২০ বছরের নিরিখে সবচেয়ে শুষ্ক জুনের রেকর্ড গড়ার পথে। সান্তাক্রুজ ও কোলাবা আবহাওয়া কেন্দ্রে যে পরিমাণ বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে, তা জুন মাসের গড়ের তুলনায় নগণ্য। বর্তমান ধারা বজায় থাকলে ২০২৬ সালের জুন মাস ২০১৪ সালের সেই ভয়াবহ শুষ্ক সময়ের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে।
এই দীর্ঘায়িত বৃষ্টির অভাবের সরাসরি প্রভাব পড়ছে জলাধারগুলিতে। মহারাষ্ট্রের জলাধারগুলিতে বর্তমানে ধারণক্ষমতার মাত্র ২৪.৫ শতাংশ জল অবশিষ্ট রয়েছে। গুজরাতের সর্দার সরোবর জলাধারের জলস্তরও আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে। জলস্তর হ্রাসের ফলে পানীয় জল সরবরাহ এবং কৃষিকাজের জন্য সেচের জল নিয়ে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বর্ষা পুনরায় গতি সঞ্চার করতে না পারে, তবে ভারতের সামগ্রিক অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং দৈনন্দিন জনজীবনে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।





