পুরসভার তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগ, ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতে আরামবাগের প্রাক্তন তৃণমূল চেয়ারম্যান

আরামবাগ পুরসভার প্রাক্তন তৃণমূল চেয়ারম্যান স্বপন নন্দীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম রাজনৈতিক বিতর্ক। গ্রিন সিটি প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ আর্থিক দুর্নীতি এবং সরকারি নথিপত্র নষ্ট করার অভিযোগে অবশেষে তাকে ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে চুঁচুড়া আদালত। তদন্তে নেমে পুলিশের হাতে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—গ্রেপ্তারের ঠিক আগেই তিনি ছদ্মবেশ ধরে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।

আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, স্বপন নন্দীর বিরুদ্ধে গ্রিন সিটি প্রকল্পের প্রায় ৭ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা তছরুপের অভিযোগ রয়েছে। পরিকল্পনার মূল বিষয় ছিল ৪৪টি স্কুলে সোলার প্যানেল বসানো। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বহু স্কুলে সেই প্যানেল বসানোই হয়নি, অথচ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সংস্থাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে মোটা টাকা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কাজের বরাত দেওয়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অযোগ্য সংস্থাকে বেছে নেওয়া হয়েছিল এবং বিনিময়ে নেওয়া হয়েছিল বিশাল অঙ্কের কমিশন।

মামলার বিশেষ পিপি বিভাস চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, যখন স্বপন নন্দীর চেয়ারম্যান পদ চলে যায়, তখন তিনি পুরসভার কম্পিউটার থেকে যাবতীয় তথ্য ও ফাইল মুছে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। যদিও পুলিশি তৎপরতায় গুগল ক্লাউডের মাধ্যমে সেই ডেটা পুনরুদ্ধারে অনেকাংশেই সফল হওয়া গেছে। এই তথ্যগুলোই এখন মামলার প্রধান প্রমাণ হিসেবে কাজ করছে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, গ্রেপ্তারি এড়াতে স্বপন নন্দী রীতিমতো ‘ফিল্মি’ কায়দায় ভোলবদলের চেষ্টা করেছিলেন। গোঁফ কামিয়ে তিনি নিজেকে অচেনা করে তোলেন এবং কেরল হয়ে মালদ্বীপে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। হুগলি গ্রামীণ পুলিশের তীক্ষ্ণ নজরের কারণে শেষ মুহূর্তে তিনি ধরা পড়ে যান। বর্তমান চেয়ারম্যান সমীর ভান্ডারীর দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতেই এই মামলা দায়ের হয়েছিল। এছাড়া প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়ের অভিযোগ, স্বপন নন্দী শুধু গ্রিন সিটি নয়, বরং আমলজুড়ে একাধিক সরকারি প্রকল্পের টাকা নয়ছয় করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, তৎকালীন বিধায়ক ও সাংসদদের জ্ঞাতসারেই এই দুর্নীতি চলছিল।

ঘটনাটির প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক তরজাও তুঙ্গে। বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য স্বপন পাল কটাক্ষ করে বলেছেন, তৃণমূল এবং দুর্নীতি এখন সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, স্বপন নন্দী সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আদালতে নিজের অবস্থানে অনড় থেকে তিনি দাবি করেন, তাকে চক্রান্ত করে ফাঁসানো হচ্ছে। তার কথায়, ‘’আমি আরামবাগে মেডিক্যাল কলেজে হেলিপ্যাড তৈরি করা সহ প্রচুর উন্নয়নের কাজ করেছি। কেরলে গিয়েছিলাম চিকিৎসার প্রয়োজনে, পালানোর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।’’ আপাতত আদালত ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেওয়ায়, এখন এই রহস্যময় দুর্নীতির শিকড় কতটা গভীরে, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।