সরকারি এবং সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশন করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল রাজ্য সরকার। দীর্ঘদিনের এই নিয়ম থাকলেও এতদিন তা কার্যত উপেক্ষা করেই চলছিল কোচিং ব্যবসা। তবে এবার সরকার পুরনো নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করতে উদ্যোগী হওয়ায় শুরু হয়েছে ব্যাপক চাপানউতোর। রাজ্যজুড়ে নজরদারি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। একদিকে যখন প্রশাসনিক নির্দেশ কার্যকর হচ্ছে, অন্যদিকে তখনই রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে উঠে আসছে পড়ুয়া ও অভিভাবকদের তীব্র প্রতিবাদ। এই পরিস্থিতির মধ্যেই পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায় এক অদ্ভুত ও তাৎপর্যপূর্ণ চিত্র দেখা গেল, যেখানে স্কুলের শিক্ষকদের কাছেই টিউশন পড়ার দাবিতে বিধায়কের কাছে ডেপুটেশন জমা দিল পড়ুয়ারা।
ঘটনার সূত্রপাত পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা বিধানসভা এলাকায়। সামনেই দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষা এবং সেমিস্টার। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশন বন্ধের সরকারি নির্দেশে দিশেহারা হয়ে পড়েছে সায়েন্স বিভাগের পড়ুয়ারা। তাদের দাবি, স্কুলের শিক্ষকরা ছাড়া বিজ্ঞান বিভাগের মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার আর কোনো বিকল্প নেই। এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষার প্রস্তুতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় তারা চন্দ্রকোনার বিজেপি বিধায়ক সুকান্ত দোলইয়ের দ্বারস্থ হয়। বিধায়কের কাছে তাদের আরজি, অন্তত এই শিক্ষাবর্ষের জন্য যেন স্কুলের শিক্ষকদের কাছে টিউশন পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
চন্দ্রকোনার এক ছাত্র হতাশা প্রকাশ করে জানায়, “সামনেই আমাদের সেমিস্টার। এই মুহূর্তে প্রাইভেট টিউশন বন্ধ হয়ে গেলে আমরা কূল হারিয়ে ফেলব। আমাদের এলাকায় সায়েন্স বিভাগের ক্ষেত্রে স্কুল শিক্ষকদের ওপরই আমরা নির্ভরশীল। উচ্চমাধ্যমিকের প্রস্তুতি কিংবা প্রবেশিকা পরীক্ষার ক্ষেত্রেও তাদের সাহায্য অপরিহার্য। হুট করে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করলে আমাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।” একইভাবে অঙ্কিতা চৌধুরী নামে এক ছাত্রী জানায়, তারা ১০ কিলোমিটার দূর থেকে কষ্ট করে পড়তে আসে শুধুমাত্র গুণমানসম্পন্ন শিক্ষার টানে। সে আক্ষেপের সুরে বলে, “এখানে এমন উপযুক্ত প্রাইভেট টিউটর নেই যিনি আমাদের সঠিক পথ দেখাতে পারবেন। মাঝপথে পড়াশোনা বন্ধ হলে আমাদের অন্য কোনো বিকল্প পথ খুঁজতে হবে।”
পড়ুয়াদের এই দীর্ঘশ্বাস ও উদ্বেগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে শুনেছেন বিধায়ক সুকান্ত দোলই। তিনি পড়ুয়াদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি এবং তাদের দাবির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তিনি দ্রুত মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এই মর্মে আবেদন জানাবেন।
সরকারি নিয়ম একদিকে যেমন শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য, তেমনই অন্যদিকে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উঠে আসছে শিক্ষার গুণমান এবং গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষকদের ওপর পড়ুয়াদের অতিনির্ভরতার বাস্তব ছবি। এখন দেখার বিষয়, ছাত্রছাত্রীদের এই আকুল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য প্রশাসন কোনো শিথিলতা বা বিশেষ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে কি না, নাকি পুরনো নিয়মেই অবিচল থাকে সরকার। আপাতদৃষ্টিতে চন্দ্রকোনার এই ঘটনা যে রাজ্যের শিক্ষামহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।





