পুলিশি তাণ্ডবে রাশ! শান্তিভঙ্গের নামে হয়রানি করলে গুনতে হবে জরিমানা, ঐতিহাসিক নির্দেশ এলাহাবাদ হাইকোর্টের

নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পুলিশ কমিশনারেট ব্যবস্থার আওতায় শান্তিভঙ্গের ধারার যথেচ্ছ অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রায় দিল এলাহাবাদ হাইকোর্ট। বিচারপতি সিদ্ধার্থ ও বিচারপতি বিনয় কুমার দ্বিবেদীর ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো নিরীহ নাগরিককে কারাগারে পাঠানো দণ্ডনীয় অপরাধ। মনসুর আহমেদ ওরফে লাল্লু নামে এক ব্যক্তির দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত প্রয়াগরাজের খেরি এলাকার বাসিন্দা মনসুর আহমেদকে অবৈধভাবে আটক করার মাধ্যমে। কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই শুধুমাত্র প্রফর্মা আদেশের ভিত্তিতে তাকে জেলে পাঠানো হয়েছিল। আট দিন অবৈধভাবে আটকে রাখার দায়ে আদালত মনসুর আহমেদকে ২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই অর্থ রাজ্য সরকার নয়, বরং তৎকালীন এসিপি-র বেতন থেকে কেটে আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারকরা।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণ শুধু মনসুর আহমেদের মামলাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রয়াগরাজের মুখ্য বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের জমা দেওয়া নথিপত্রে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেখা যাচ্ছে, প্রয়াগরাজ ও গাজিয়াবাদসহ বিভিন্ন জেলায় পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্বিচারে মানুষকে কারাগারে বন্দি করছেন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে ২৮৩ জন, ২০২৫ সালে ১,৩২১ জন এবং ২০২৬ সালের এই অল্প সময়ে ৭২১ জনকে এই ব্যবস্থার নামে আটকে রাখা হয়েছে। মোট ২,৩২৫ জন নিরপরাধ মানুষ শুধুমাত্র এক সপ্তাহ থেকে ২০ দিন মেয়াদে কারাগারের অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন।
এই স্বেচ্ছাচারিতা রুখতে আদালত কঠোর নির্দেশিকা জারি করেছে:
১. শান্তিভঙ্গের ক্ষেত্রে এখন থেকে আর বাইরে থেকে জামিনদারের প্রয়োজন হবে না।
২. মাত্র ২০,০০০ টাকার ব্যক্তিগত বন্ড জমা দিলেই তাৎক্ষণিক মুক্তি পাওয়া যাবে।
৩. যদি কোনো ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার বেশি অবৈধভাবে আটক রাখা হয়, তবে প্রতিদিন ২৫,০০০ টাকা হারে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৪. এই ক্ষতিপূরণ ওই অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বেতন থেকে কাটা হবে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
বিচারপতিদের স্পষ্ট বার্তা, পুলিশ ও প্রশাসনের কাজ আইন প্রয়োগ করা, মানুষের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করা নয়। আদালত প্রয়াগরাজ পুলিশ কমিশনারকে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬-এর মধ্যে এই নির্দেশ মান্য করার রিপোর্ট জমা দিতে বলেছে। আইনজীবীদের মতে, এই রায় দেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি নজির হয়ে থাকবে, যা শান্তিভঙ্গের আইনের অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার প্রবণতাকে চিরতরে বন্ধ করবে।