আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির অগ্নিমূল্য সত্ত্বেও ভারতীয় পরিবারগুলোর রান্নাঘরে স্বস্তি বজায় রাখল কেন্দ্রীয় সরকার। পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর তুলনায় ভারত অনেক কম দামে রান্নার গ্যাস (LPG) জোগান দিচ্ছে। বর্তমানে দিল্লির সাধারণ গ্রাহকরা ১৪.২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার পাচ্ছেন ৯৪২ টাকায়, অথচ সেই গ্যাস সরবরাহ করতে প্রকৃত খরচ ১৬০০ টাকারও বেশি। এই বিপুল ফারাক বা ‘আন্ডার-রিকভারি’-র বোঝা সরকার নিজে বহন করছে, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপের আঁচ না লাগে।
প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনার (PMUY) গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এই সাশ্রয় আরও বেশি। উজ্জ্বলা গ্রাহকরা ভর্তুকি বাবদ সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৩০০ টাকা পান, যার ফলে তাদের জন্য সিলিন্ডারের কার্যকরী দাম দাঁড়ায় মাত্র ৬৪২ টাকা। পরিসংখ্যান বলছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে বিশ্ববাজারে এলপিজি-র দাম প্রায় ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত পশ্চিম এশিয়ার সংকট এবং হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন এলপিজি-র দাম ৫৪৩ ডলার থেকে বেড়ে ৭৯০ ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু ভারত সরকার সেই দামের ধাক্কা সাধারণ মানুষকে দিতে চায়নি।
তুলনামূলক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ভারতে যেখানে সাধারণ গ্রাহক প্রায় ৯৪২ টাকায় সিলিন্ডার পাচ্ছেন, সেখানে পাকিস্তানে এই দাম ১০৪৬ টাকা, নেপালে ১২০৭ টাকা, বাংলাদেশে ১২২৫ টাকা এবং শ্রীলঙ্কায় ১২৪১ টাকা। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এই পার্থক্য আকাশচুম্বী। আমেরিকায় এলপিজি-র দাম প্রায় ১৭৫৫ টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ১৭৬৫ টাকা এবং কানাডায় তা ২৪১১ টাকা ছাড়িয়েছে। ভারতের কৌশলগত পদক্ষেপের কারণেই এই বিপুল সংকটকালেও দেশে গ্যাসের কোনো হাহাকার তৈরি হয়নি।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতের প্রায় ৫৪ শতাংশ এলপিজি আমদানি হতো। সংকটকালীন পরিস্থিতিতেও ভারত নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রেখেছে। এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ৩২ টিএমটি থেকে বাড়িয়ে ৫২ টিএমটি করা হয়েছে এবং আমেরিকা, কানাডা ও আলজেরিয়ার মতো দেশগুলো থেকে গ্যাস আমদানির বিকল্প পথ খুলে রাখা হয়েছে। কালোবাজারি রুখতে ওটিপি-ভিত্তিক ডেলিভারি ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা ৯০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা ভর্তুকির গ্যাস বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার হওয়া আটকাচ্ছে।
গত অর্থবর্ষে ঘরোয়া এলপিজি-র আন্ডার-রিকভারি ৬০,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল, যার অর্ধেক বা ৩০,০০০ কোটি টাকা সরকার তেল সংস্থাগুলোকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিচ্ছে। সরকার কেবল ভর্তুকি নয়, প্রতিটি সিলিন্ডার পিছু প্রায় ৭০০ টাকার লোকসান বহন করে সাধারণের রান্নাঘর সচল রাখছে। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের পক্ষ থেকে নাগরিকদের এই মূল্যবান সম্পদ সাশ্রয়ী উপায়ে ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের উত্তাল পরিস্থিতির মাঝেও ভারতের এই জ্বালানি সুরক্ষা ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখতে এক মজবুত ঢাল হিসেবে কাজ করছে।





