‘অপদ বিদায়’, টলিপাড়ার ত্রাস স্বরূপ বিশ্বাস গ্রেফতার হতেই শিল্পীদের বাঁধভাঙা উল্লাস!

টলিউডের অন্দরমহলে দীর্ঘদিনের ‘অরাজকতা’ ও ভয়ের পরিবেশের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পুলিশের জালে ফেডারেশনের প্রাক্তন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস। নিগ্রহ, শ্লীলতাহানি এবং তোলাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতে তাঁকে গ্রেফতার করে নিউ আলিপুর থানা। এই ঘটনায় শুক্রবার তাঁকে আদালতে পেশ করার কথা রয়েছে। স্বরূপ বিশ্বাসের গ্রেফতারের খবরে কার্যত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে গোটা টলিপাড়া।

অভিযোগের পাহাড় দীর্ঘদিনের। রূপটান শিল্পী সিমরন পালের অভিযোগ, গিল্ডের কার্ড নিয়ে জটিলতা তৈরি করে তাঁকে টানা দু’বছর কাজ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। গিল্ডের সম্পাদক বাপি মালাকারকে জানিয়েও সুরাহা না মেলায় ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসকে চিঠি লিখেছিলেন তিনি। আর তার পরেই শুরু হয় প্রাণনাশের হুমকি। বাধ্য হয়ে গত ১০ এপ্রিল গল্ফ গ্রিন থানায় ব্যক্তিগত নিরাপত্তার আবেদন জানিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন সিমরন। শুধু সিমরন নন, টলিপাড়ার বহু পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতা দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর বিরুদ্ধে তোলাবাজি, হুমকি এবং কাজ বন্ধ করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ তুলে আসছিলেন।

স্বরূপ বিশ্বাসের গ্রেফতারি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ ও স্বস্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন টলিউডের প্রথম সারির শিল্পীরা। পরিচালক সৃজিত রায় নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে লেখেন, “এক বছর আগে আমার কাজ বন্ধ করা হয়েছিল, জোর করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছিল। সতীর্থদের ব্যান করা হয়েছিল। আজ তিনি শ্রীঘরে, ঈশ্বর আছেন।” প্রযোজক রানা সরকার, অভিনেতা সুব্রত দত্ত থেকে পরিচালক সায়ন্তন মুখোপাধ্যায়—সকলেই এই পদক্ষেপকে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচার বলে অভিহিত করেছেন। অনেকের মতে, টলিউডের তোলাবাজি সংস্কৃতির মূলে আঘাত হানা হলো। পরিচালক জয়ব্রত দাশ প্রশ্ন তুলেছেন, সেই সব ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে, যারা অতীতে এই অশুভ শক্তির হয়ে ওকালতি করেছিলেন। অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী এবং সঞ্চালক লাজবন্তী রায়ও এই গ্রেফতারিতে আনন্দ প্রকাশ করে টলিপাড়ার ‘অশান্তি’ দূর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর অত্যন্ত কড়া ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে তোলাবাজি সংক্রান্ত ধারা ৩০৮(৪) ও ৩০৮(৫), খুনের চেষ্টার (Attempt to Murder) জন্য ধারা ১০৯ এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারা ৬১ মামলা রুজু করা হয়েছে। এছাড়া, ভয় দেখানো ও হুমকি দেওয়ার জন্য ধারা ৩৫১(৩) এবং বেআইনি অস্ত্র রাখার অপরাধে আর্মস অ্যাক্টের ২৫ ও ২৭ নম্বর ধারায় মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

একসময় ফেডারেশনের ক্ষমতাকে ঢাল করে টলিপাড়ায় যে ‘সমান্তরাল শাসন’ চলত, স্বরূপ বিশ্বাসের এই গ্রেফতারি সেই ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে প্রশ্ন উঠছে, এই অপরাধচক্রের সঙ্গে আর কারা যুক্ত ছিল? তবে আপাতত শিল্পীদের স্বর বলছে, টলিপাড়ার দীর্ঘদিনের এক অন্ধকার অধ্যায় যেন শেষ হলো। এখন তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয় এবং আইনি লড়াইয়ে স্বরূপ বিশ্বাস কী সম্মুখীন হন, সেদিকেই তাকিয়ে আছে গোটা টলিউড।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy