প্রতিদিন আমরা যে খাবার গ্রহণ করছি, তা কি সত্যিই নিরাপদ? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক এক বিধ্বংসী রিপোর্টে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। সংস্থাটির নতুন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ৮৬ কোটিরও বেশি মানুষ পচা ও দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এর মধ্যে করুণ পরিণতির শিকার হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন ১৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই ঝুঁকির মূলে রয়েছে শিশুরা। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় পচা খাবার থেকে অসুস্থ হওয়ার প্রায় তিনগুণ বেশি ঝুঁকিতে থাকে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৯ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও, খাদ্যবাহিত অসুস্থতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। ডায়রিয়ার মতো রোগ তাদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। পাশাপাশি, খাদ্যে উপস্থিত মিথাইলমার্কারি ও সীসার মতো বিষাক্ত রাসায়নিক তাদের মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি করছে, যা আজীবন স্নায়বিক ও বিকাশজনিত সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
২০২১ সালের তথ্যানুযায়ী, অধিকাংশ খাদ্যবাহিত অসুস্থতা (প্রায় ৮৬০ মিলিয়ন) ঘটেছে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার মতো জৈবিক ঝুঁকির কারণে। তবে মৃত্যুর হার বিবেচনায় রাসায়নিক ঝুঁকি অনেক বেশি ভয়াবহ। ওই বছর খাদ্যদূষণজনিত মোট মৃত্যুর ৭৩% ঘটেছে রাসায়নিক সংস্পর্শে। এর মধ্যে অজৈব আর্সেনিক (৪২%) এবং সীসার (৩১%) প্রভাব সবচেয়ে বেশি, যা হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি ডেকে আনছে।
শুধু মানবিক ক্ষতি নয়, অর্থনৈতিকভাবেও বিশ্ব এক বড় সংকটের সম্মুখীন। খাদ্যবাহিত অসুস্থতার কারণে উৎপাদনশীলতার যে ক্ষতি হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য প্রায় ৩১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জীবনযাত্রার মানদণ্ডের সঙ্গে সমন্বয় করলে এই অঙ্ক ৬৪৭ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ডঃ টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসুস সতর্ক করে বলেছেন, “খাদ্য নিরাপত্তা কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়। আমরা এতদিন এর প্রকৃত মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বিশালতা বুঝতে পারিনি।” এই প্রথমবারের মতো ১৯৪টি দেশ থেকে সংগৃহীত ৪২টি প্রধান খাদ্যবাহিত ঝুঁকির তথ্য সরকারগুলোর সামনে এসেছে। এখন সময় এসেছে উন্নত কৃষি পদ্ধতি, কঠোর শিল্প নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তিশালী পরিবেশগত বিধিবিধানের মাধ্যমে খাদ্য শৃঙ্খলে বিষক্রিয়া রোধ করার। আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো অঞ্চলে যেখানে মৃত্যুর হার ৬০%, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।





