কল্যাণীতে শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে যখন শোরগোল তুঙ্গে, ঠিক তখনই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে কার্যত পারমাণবিক বোমা ফাটালেন রাজ্যসভার সাংসদ তথা প্রবীণ নেতা সুখেন্দুশেখর রায়। মঙ্গলবার সকালে নিজের ফেসবুক পেজে তিনি রোমান সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে সরাসরি লিখেছেন, “পশ্চিমবঙ্গের মানুষ অসহনীয় নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়েছেন।” এই একটি বাক্যেই তৃণমূলের অন্দরের অস্থিরতা প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
দীর্ঘ ছয় দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিকের এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনা। দলের ঘনিষ্ঠমহলে তিনি পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। সুখেন্দুবাবুর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০১১ সালে বাংলার মানুষ যেভাবে সিপিএমকে সরিয়ে তৃণমূলকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল, ২০২৬ সালে ঠিক সেই কায়দাতেই তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মানুষ বিজেপির ওপর ভরসা রেখেছে।
তৃণমূলের এই ভরাডুবির পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন সুখেন্দুশেখর রায়। প্রথমত, ২০২৪ সালে আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা। তিনি মনে করেন, সেই ঘটনার প্রতিবাদে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন, তখনই দলের পতনের ঘণ্টা বেজে গিয়েছিল। কিন্তু তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব সেই জনরোষের সংকেত বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দলের ভেতরে গ্রাস করা দুর্নীতি। তাঁর অভিযোগ, আজ রাজ্যের যেকোনো গ্রামের দিকে তাকালে দেখা যায়, সবচেয়ে বিলাসবহুল বাড়িটি স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধানের। এই দৃশ্য সাধারণ মানুষ আর সহ্য করতে পারেনি। তৃতীয়ত, বিকল্পের সন্ধান। সাধারণ মানুষ তৃণমূলের নৈরাজ্য থেকে মুক্তি পেতে বিকল্প শক্তি হিসেবে বিজেপিকে বেছে নিয়েছে।
লোকসভা নির্বাচনে ২৯টি আসন পাওয়ার মাত্র দু’বছরের মাথায় দলের এই শোচনীয় দশা কেন হলো, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। দলের ভেতর ‘শুদ্ধকরণ’ বা আত্মসমীক্ষার দাবি তুলে সুখেন্দুবাবু বুঝিয়ে দিয়েছেন, ঘাসফুল শিবিরের অন্দরে পরিবর্তনের হাওয়া শুধু বাইরে নয়, ভেতর থেকেও শুরু হয়েছে। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের মতো নেতাদের পদ থেকে সরানো এবং তারপর সুখেন্দুশেখর রায়ের এই বিস্ফোরক মন্তব্য তৃণমূলকে যে চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। তৃণমূলের এই বিপর্যয় এখন কেবল রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং দলের অন্দরের ভাঙনের এক স্পষ্ট দলিল হয়ে উঠেছে। এখন দেখার, এই প্রবীণ সাংসদের মন্তব্যের পাল্টা কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে কি শীর্ষ নেতৃত্ব, নাকি এই বিদ্রোহ আরও ব্যাপক রূপ নেয়।





