আসন্ন কুরবানি ঈদের আগে রাজ্যে গোহত্যা ও পশুবলি সংক্রান্ত মামলার আইনি লড়াই এবার এক নজিরবিহীন মোড় নিল। কলকাতা হাইকোর্টে এই সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানির সময় এজলাসে উঠল এমন কিছু প্রশ্ন, যা এর আগে রাজ্যের কোনো আইনি শুনানিতে সচরাচর শোনা যায়নি। ‘পশুর বয়স কত?’ থেকে শুরু করে ‘কসাইখানার ছাড়পত্র দেওয়ার মাপকাঠি কী?’— রাজ্য প্রশাসনের আইনজীবীদের দিকে বিচারপতিদের ছিটকে আসা একের পর এক ধারালো প্রশ্নে এদিন টানটান উত্তেজনা তৈরি হয় আদালত কক্ষে।
ভরা আদালতে বিচারপতিদের নজিরবিহীন সওয়াল-জবাব
কলকাতা হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতিদের ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলাকালীন, রাজ্যে ১৯৫০ সালের ‘পশু সংরক্ষণ আইন’ (West Bengal Animal Preservation Act) কতটা কঠোরভাবে মানা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে চান বিচারপতিরা। শুনানির মূল অংশগুলি নিচে তুলে ধরা হলো:
বয়স নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী?: আইন অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট বয়সের আগে কোনো গবাদি পশুকে জবাই করা নিষিদ্ধ। এদিন আদালত সরাসরি প্রশ্ন তোলে, “যেসব পশুকে জবাইয়ের জন্য আনা হচ্ছে, তাদের সঠিক বয়স কত তা নির্ধারণ করার জন্য সীমান্তে বা কসাইখানায় কী পরিকাঠামো রয়েছে? স্রেফ দাঁত দেখে নাকি কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বয়স যাচাই করা হচ্ছে?”
ফিটনেস সার্টিফিকেট কে দিচ্ছে?: নিয়মানুযায়ী, পশু চিকিৎসকের (Veterinary Surgeon) লিখিত শংসাপত্র ছাড়া কোনো পশুকে কসাইখানায় পাঠানো যায় না। আদালত ক্ষোভ প্রকাশ করে জানতে চায়, হাজার হাজার পশুর ক্ষেত্রে এই নিয়ম কি আদৌ বাস্তবায়িত হচ্ছে, নাকি স্রেফ কাগজে-কলমেই সই মিলছে?
জনসমক্ষে কেন পশুবলি?: মহামান্য আদালত স্পষ্ট করে দেয় যে, আইন মোতাবেক সাধারণ মানুষের চোখের সামনে বা প্রকাশ্য রাস্তায় কোনো পশুবলি বা জবাই করা যাবে না। প্রশাসন এই নিয়ম ভাঙলে কী কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে, তারও খতিয়ান চাওয়া হয়।
আদালতের তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ: শুনানির সময় ডিভিশন বেঞ্চের তরফে মন্তব্য করা হয়, “আইন সবার জন্য সমান। পশুদের ওপর নিষ্ঠুরতা রোধে যে আইন তৈরি হয়েছে, তা উৎসবের দিনগুলিতেও সমানভাবে প্রযোজ্য। প্রশাসনের ঢিলেঢালা মনোভাবের কারণে কোনো বেআইনি কাজকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।”
কোণঠাসা প্রশাসন, কড়া নির্দেশের পথে হাইকোর্ট
আদালতের এই তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখে রাজ্যের আইনজীবীরা জানান যে, সরকার আইন শৃঙ্খলার পাশাপাশি পশু সুরক্ষা আইন বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর এবং নির্দিষ্ট গাইডলাইন মেনে পুলিশি নজরদারি চালানো হচ্ছে। তবে এই জবাবে পুরোপুরি সন্তুষ্ট না হয়ে আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, অবৈধ পশু পরিবহন এবং লাইসেন্সহীন কসাইখানা বন্ধ করতে রাজ্যকে অবিলম্বে একটি অ্যাকশন প্ল্যান জমা দিতে হবে।
আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতা হাইকোর্টের এই নজিরবিহীন প্রশ্নগুলি রাজ্যের প্রশাসনিক নজরদারির গলদগুলিকে আরও একবার সামনে এনে দিল। আসন্ন উৎসবের মরশুমে এই রায়ের প্রভাব কতটা কড়াভাবে মাটিতে কার্যকর হয়, এখন সেটাই দেখার।





