সুস্থ থাকতে চিকিৎসকরা প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কেউ ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় হাঁটতে পছন্দ করেন, তো কেউ আবার বিকেলের ফুরফুরে বাতাসে পার্কের রাস্তা বেছে নেন। কিন্তু হাঁটার সময় আপনি ঠিক কতটা গতি বজায় রাখছেন, তা কখনো খেয়াল করেছেন কি? চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা কিন্তু এই বিষয়েই এক চোখ কপালে তোলার মতো তথ্য সামনে এনেছে। গবেষকদের দাবি, একজন মানুষের হাঁটার গতি দেখেই নাকি অনুমান করা সম্ভব তার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য এবং আয়ু!
সহজ কথায়, যাঁরা স্বাভাবিকের তুলনায় একটু দ্রুত হাঁটেন, তাঁদের দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেকটাই বেশি। অর্থাৎ, হাঁটার অভ্যাস কেবল আপনাকে ফিট রাখছে না, এটি আপনার দীর্ঘায়ুর চাবিকাঠিও হতে পারে।
হাঁটার গতি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
দ্রুত হাঁটা মানে কেবল তাড়াহুড়ো করা নয়। এটি আসলে আপনার শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গের সমন্বিত কার্যক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা। একজন মানুষ যখন দ্রুত হাঁটেন, তখন তাঁর হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, পেশি, হাড়ের সংযোগস্থল এবং স্নায়ুতন্ত্রকে একসঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হয়।
চিকিৎসকদের মতে, দ্রুত হাঁটার সক্ষমতা প্রমাণ করে যে শরীরের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো এখনও পুরোপুরি সচল এবং সুস্থ রয়েছে। অন্যদিকে, স্বাভাবিকের চেয়ে ধীরগতির হাঁটা অনেক সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ কোনো দুর্বলতা বা লুকিয়ে থাকা স্বাস্থ্য সমস্যার প্রাথমিক ইঙ্গিত হতে পারে।
২৫ হাজার মানুষের ওপর গবেষণা: কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
আমেরিকার পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় ২৫ হাজার প্রবীণ মানুষের ওপর একটি বিস্তর গবেষণা চালিয়েছেন। সেই গবেষণার ফলাফল রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। দেখা গেছে, যাঁরা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ মিটার বা তার বেশি গতিতে হাঁটতে পারেন, তাঁদের গড় আয়ু অন্যদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
অন্যদিকে, যাঁদের হাঁটার গতি প্রতি সেকেন্ডে ০.৮ মিটারের কম, তাঁদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে। গবেষকদের মতে, হাঁটার গতি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় যে একে রক্তচাপ বা পালস রেটের মতো একটি ‘ভাইটাল সাইন’ বা স্বাস্থ্যের প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে ৬৫ বছর বয়স পার হওয়ার পর স্বাস্থ্যঝুঁকি বোঝার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর একটি উপায়।
ধীরগতির হাঁটা কীসের লক্ষণ?
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, হঠাৎ হাঁটার গতি কমে যাওয়া অনেক সময় হৃদরোগ, স্ট্রোক কিংবা ডিমেনশিয়ার (স্মৃতিভ্রম) মতো জটিল স্নায়বিক সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। শরীর যখন ভেতর থেকে দুর্বল হতে শুরু করে, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই গতি হারিয়ে ফেলে।
তবে ধীরগতিতে হাঁটার মানেই যে বড় কোনো অসুখ, তা কিন্তু নয়। বরং এটিকে শরীরের একটি আগাম সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা উচিত, যা আমাদের নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে আরও বেশি সচেতন হওয়ার সুযোগ করে দেয়।
দ্রুত হাঁটার অবিশ্বাস্য উপকারিতা
হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা: দ্রুত হাঁটার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি হার্টকে দারুণভাবে সক্রিয় রাখে। নিয়মিত দ্রুত হাঁটলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন ভালো হয় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি এক ধাক্কায় অনেকটা কমে যায়।
ওজন নিয়ন্ত্রণ: ধীরগতিতে হাঁটার চেয়ে দ্রুত হাঁটলে শরীর অনেক বেশি ক্যালরি খরচ করে। ফলে যাঁরা ওজন কমাতে চাইছেন, তাঁদের জন্য ‘ব্রিস্ক ওয়াকিং’ বা দ্রুত হাঁটার কোনো বিকল্প নেই।
মানসিক অবসাদ মুক্তি: দ্রুত হাঁটার সময় শরীরে এন্ডোরফিন নামের এক ধরনের হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মনকে নিমেষেই ভালো করে দেয় এবং মানসিক চাপ বা স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে।
পেশি ও জয়েন্টের জোর: এটি পায়ের পেশিকে শক্তিশালী করে, হাড়ের জয়েন্টগুলো সচল রাখে এবং বয়স বাড়লেও শরীরকে সহজে বুড়িয়ে যেতে দেয় না।
কীভাবে বদলাবেন নিজের অভ্যাস?
এর জন্য প্রথম দিন থেকেই খুব দ্রুত দৌড়ানোর বা হাঁটার কোনো প্রয়োজন নেই। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, প্রতিদিনের স্বাভাবিক হাঁটার গতিকে একটু একটু করে বাড়ানোর চেষ্টা করুন।
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট এমন গতিতে হাঁটুন, যাতে শরীর থেকে সামান্য ঘাম বের হয় এবং বুক কিছুটা ধড়ফড় করে, অথচ কারও সঙ্গে কথা বলতে কোনো সমস্যা না হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটিই হলো ব্রিস্ক ওয়াকিংয়ের আদর্শ গতি।
হাঁটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর ব্যায়ামগুলোর একটি। তবে এখন থেকে শুধু হাঁটার জন্যই হাঁটা নয়, নজর দিন নিজের গতির দিকেও। কারণ আপনার পায়ের গতিই নির্ধারণ করে দিচ্ছে আপনার আগামীর সুস্থতা!





