আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসক ‘অভয়া’-র নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড মামলার তদন্তে গাফিলতির অভিযোগে এক নজিরবিহীন ও বড় পদক্ষেপ নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ঘটনার তদন্তে চরম গাফিলতি এবং তথ্যপ্রমাণ লোপাটের চেষ্টার অভিযোগে কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার বিনীত কুমার গোয়েলসহ তিন জন আইপিএস কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পর এবার সরাসরি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন নির্যাতিতার মা ও বিজেপি নেত্রী রত্না দেবনাথ।
শুক্রবার রাজ্য প্রশাসনের এই বড় পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আমরা আরজি কর কাণ্ডের তদন্ত এবং তৎকালীন পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু করেছি। বিশেষ করে কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন সিপি বিনীত কুমার গোয়েলসহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলাটি সামলানোর ক্ষেত্রে চরম গাফিলতির অভিযোগ ছিল।” মুখ্যমন্ত্রী আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনে জানান, “এমন গুরুতর অভিযোগও রয়েছে যে, সে সময় দুজন পুলিশ কর্মকর্তা অভয়ার পরিবারকে মুখ বন্ধ রাখার জন্য ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা আমাদের সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার। তাই বিনীত গোয়েল, ইন্দিরা মুখার্জি এবং অভিষেক গুপ্ত—এই তিন আইপিএস কর্মকর্তাকে তৎক্ষণাৎ বরখাস্ত করা হয়েছে।”
“মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই সবকিছুর মূল হোতা”
সরকারের এই কড়া পদক্ষেপের পর মুখ খুলেছেন নির্যাতিতা চিকিৎসকের মা রত্না দেবনাথ। তবে পুলিশ কর্তাদের এই শাস্তিতেই তিনি শান্ত হচ্ছেন না। তাঁর সরাসরি অভিযোগের তির রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে।
রত্না দেবনাথ অত্যন্ত আবেগঘন ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, “এই ঘটনার পেছনে অনেক অপরাধী লুকিয়ে আছে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন তাদের সকলের নেত্রী। যদি তাঁকে সঠিক তদন্তের মুখোমুখি করে জেলে পাঠানো যায়, তবেই বাকি সমস্ত অপরাধীদের নাম ও আসল সত্য আড়াল থেকে বেরিয়ে আসবে।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, “ঘটনার সেই অভিশপ্ত রাতে যারা আমার মেয়ের সঙ্গে বসে রাতের খাবার খেয়েছিল, সেই সহপাঠী বা চিকিৎসকদের কেন এখনও সঠিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো না?”
কাঠগড়ায় কলেজ প্রশাসন ও প্রাক্তন স্বাস্থ্য সচিব
তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে নির্যাতিতার মা আরও দাবি করেন, “এখনও পর্যন্ত শুধু আরজি করের প্রাক্তন অধ্যক্ষই জেলে আছেন। কিন্তু আমার মেয়ের এই নৃশংস পরিণতি ও হত্যাকাণ্ডের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ তৎকালীন পুরো কলেজ প্রশাসন দায়ী।” এখানেই শেষ নয়, তিনি তৎকালীন স্বাস্থ্য সচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগমের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন যে, নিগমও এই গোটা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য চক্রান্তে জড়িত ছিলেন।
আরজি কর কাণ্ড নিয়ে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শুভেন্দু সরকারের এই তিন আইপিএস-কে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। একদিকে যখন নতুন সরকার আইনি ও প্রশাসনিক স্তরে বড়সড় রদবদল ঘটিয়ে স্বচ্ছতা আনার বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে নির্যাতিতার পরিবারের এই বিস্ফোরক বয়ান প্রমাণ করে দিচ্ছে যে আরজি করের ক্ষত এবং সুবিচারের লড়াই এখনও কতটা জ্বলন্ত।





