বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের মাঝে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক সফরে রওনা দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া এই ছয় দিনের ম্যারাথন কূটনৈতিক সফরে তিনি বিশ্বের পাঁচটি প্রভাবশালী দেশ— সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (UAE), নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়ে এবং ইতালি সফর করবেন। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করা, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা সম্প্রসারণই এই উচ্চপর্যায়ের সফরের মূল লক্ষ্য। গোটা বিশ্ব এখন দিল্লির এই কূটনৈতিক চালের দিকে নজর রাখছে।
সফরের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী পৌঁছাবেন সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে (১৪-১৫ মে)। সেখানে ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে এক হাই-প্রোফাইল দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন তিনি। এই বৈঠকে ভারত-ইউএই সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারিত্বের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা, পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সেখানে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ প্রবাসী ভারতীয়দের কল্যাণ নিয়ে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে নিবিড় আলোচনা হবে।
আমিরশাহি পর্ব শেষ করে প্রধানমন্ত্রী মোদি পৌঁছাবেন নেদারল্যান্ডসে (১৫-১৭ মে)। সেখানে ডাচ রাজা উইলেম-আলেকজান্ডার এবং রানি ম্যাক্সিমার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি। এরপর ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন-এর সঙ্গে এক প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকের মূল এজেন্ডা হলো— প্রতিরক্ষা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং, গ্রিন হাইড্রোজেন এবং জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা। নেদারল্যান্ডসের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিকে ভারতের বাজারে নিয়ে আসাই এই আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য।
১৭ মে প্রধানমন্ত্রী পা রাখবেন সুইডেনে। সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), উদীয়মান প্রযুক্তি, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম, প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং স্থিতিশীল সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলার বিষয়ে কথা হবে। এই সফরের একটি অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ হলো ইউরোপীয় ইন্ডাস্ট্রি রাউন্ড টেবিলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, যেখানে উপস্থিত থাকবেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন।
১৮-১৯ মে প্রধানমন্ত্রীর গন্তব্য নরওয়ের অসলো। সেখানে তিনি তৃতীয় ইন্ডিয়া-নর্ডিক সামিটে যোগ দেবেন। নরওয়ের রাজা হারাল্ড (পঞ্চম) এবং রানি সোনিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের পাশাপাশি নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন মোদি। ইন্ডিয়া-নরওয়ে বিজনেস ও রিসার্চ সামিটে বক্তব্য রাখার পাশাপাশি ক্লিন টেকনোলজি, ব্লু ইকোনমি এবং ইন্ডিয়া-EFTA সহযোগিতা নিয়ে কথা হবে। এই সামিটের ফাঁকেই ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও সুইডেনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মোদির রুদ্ধদ্বার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
সফরের শেষ পর্যায়ে (১৯-২০ মে) প্রধানমন্ত্রী পৌঁছাবেন ইতালিতে। ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেল্লার সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিধি বাড়াতে ‘ভারত-ইতালি যৌথ কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা (২০২৫–২০২৯)’ বাস্তবায়ন নিয়ে চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হবে এখানে। প্রতিরক্ষা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে যৌথ উদ্ভাবনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নরেন্দ্র মোদির এই পাঁচ দেশীয় সফর ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মানচিত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করবে। সেমিকন্ডাক্টর থেকে গ্রিন হাইড্রোজেন, এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে প্রতিরক্ষা— সব মিলিয়ে ভারতের গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনকে আরও মজবুত করতে এই সফর অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।





