ভারতীয় রাজনীতির গ্ল্যামার আর প্রচারের আলোকবৃত্ত থেকে শতহস্ত দূরে থাকতেই ভালোবাসেন তিনি। অথচ তাঁর ছক কষা চালেই কুপোকাত হচ্ছে একের পর এক বাঘা বাঘা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। তিনি সুনীল বনসল—বিজেপির অন্দরে যাঁকে ডাকা হয় ‘অজেয় সাংগঠনিক মস্তিষ্ক’ নামে। যেখানেই কঠিন লড়াই, যেখানেই জেতার আশা ক্ষীণ, সেখানেই নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের তুরুপের তাস এই আরএসএস প্রচারক।
ইউপি থেকে ওড়িশা: জয়ের জাদুকর
বনসলের সাফল্যের রূপকথা শুরু হয়েছিল উত্তরপ্রদেশ থেকে। ২০১৪ সালে যখন বিজেপি কার্যত খাদের কিনারে, তখন অমিত শাহের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ৮০টির মধ্যে ৭১টি আসন ছিনিয়ে এনেছিলেন তিনি। তাঁর সেই ‘বুথ ম্যানেজমেন্ট’ মডেল উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। তবে তাঁর আসল জাদু দেখা গেল ওড়িশায়। যে রাজ্যে ২০১৯ সালেও বিজেডি-র নবীন পট্টনায়েকের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, সেখানে ২০২৪-এ এসে ম্যাজিক দেখালেন বনসল। লোকসভার ২০টি আসনের মধ্যে ২০টিই দখল করল বিজেপি, আর বিধানসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গড়ল সরকার। শূন্য হাতে ফিরতে হলো পট্টনায়েককে।
কী সেই ‘বনসল মডেল’?
সুনীল বনসলের রাজনীতির মূল মন্ত্র হলো ‘ডেটা’ এবং ‘বুথ’। তিনি কেবল জনসভায় বিশ্বাসী নন, বরং প্রতিটি বুথকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্লাস্টারে ভাগ করে ৫০-৬০ জন ভোটারের দায়িত্ব একেকজন কর্মীর ওপর সঁপে দেন। তাঁর কৌশলে ফাঁকি দেওয়ার কোনো জায়গা নেই। ওড়িশা থেকে তেলঙ্গানা—সর্বত্রই তিনি প্রমাণ করেছেন যে, মজবুত সংগঠন থাকলে যেকোনো শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তিকে হারানো সম্ভব।
বাংলায় ‘অপারেশন ২০২৬’ এবং বনসল
পশ্চিমবঙ্গেও গত চার বছর ধরে নিশব্দে জাল বুনেছেন বনসল। ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে মিলে তিনি রাজ্যের ৮০ হাজার বুথের মধ্যে ৬৫ হাজারেরও বেশি বুথে সক্রিয় কমিটি গড়ে তুলেছেন। পুরনো ও নিষ্ক্রিয় কর্মীদের ঘরে ঘরে গিয়ে ফিরিয়ে আনা এবং নবাগতদের শৃঙ্খলায় বাঁধার কঠিন কাজটি তিনি করেছেন পর্দার আড়ালে থেকে। তাঁর নজর ছিল স্বচ্ছ ভাবমূর্তি আর তৃণমূল স্তরের শক্তির ওপর। কোনো বাগাড়ম্বর নয়, বরং প্রতিদিন গড়ে ২৫টি সভা এবং রাত জেগে কর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগই তাঁর শক্তির উৎস।
সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা বা হেডলাইন থেকে দূরে থাকা এই মানুষটিই আসলে বিজেপির জয়ের গ্যারান্টি। মোদী-শাহের স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে রূপান্তর করার কারিগর হলেন সুনীল বনসল। ২০২৬-এর বাংলার লড়াইয়ে এই ‘অদৃশ্য’ যোদ্ধার স্ট্র্যাটেজি কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।





