২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে গিয়েছে। আর সেই পরিবর্তনের আঁচ এবার পড়ল খাস কলকাতায়। মঙ্গলবার রাতে খোদ নিউ মার্কেট চত্বরে কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা তৈরি হলো। তারস্বরে ডিজে-র গর্জন আর মুহুর্মুহু বোমাবাজির মধ্যেই এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী থাকল শহরবাসী। পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সামনেই জেসিবি (JCB) দিয়ে কলকাতা পুরসভা লাগোয়া তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় এবং একটি মাংসের দোকান গুঁড়িয়ে দিল গেরুয়া বাহিনী।
নিজেদের খাসতালুক বলে পরিচিত এলাকায় তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের (INTTUC) এই অফিসটি ছিল দীর্ঘদিনের। কিন্তু রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের চব্বিশ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই সেই নীল-সাদা পার্টি অফিসের অস্তিত্ব মেটাল বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। শুধু কলকাতা পুরসভার পিছনের দিকের অফিসই নয়, মেয়রের গেটের ঠিক উল্টো দিকে থাকা টিনের শেডের আরেকটি দলীয় কার্যালয়ও জেসিবি দিয়ে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার সময় বাইক বাহিনীর ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানে কেঁপে ওঠে গোটা চত্বর। অথচ একসময়ের দাপুটে তৃণমূল নেতাদের কাউকেই এলাকায় দেখা যায়নি।
এদিকে, এই ঘটনার পাশাপাশি নিউ মার্কেট চত্বরে এক রহস্যময় নির্জনতা দেখা গিয়েছে। যে এলাকায় বছরের ৩৬৫ দিন থিকথিকে ভিড় থাকে, যেখানে হকারদের দাপটে পায়ে হেঁটে যাওয়ার জায়গা থাকে না, সেই চত্বর এখন কার্যত হকারশূন্য। অদৃশ্য কোনো নির্দেশে যেন রাতারাতি রাস্তা পিচ চকচক করছে। দোকানের ডালাগুলো বন্ধ, চারদিকে এক চাপা আতঙ্ক গ্রাস করেছে সাধারণ হকারদের। তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের ছাতার তলায় থাকা এই হকাররা এখন অভিভাবকহীন বোধ করছেন। প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে রদবদলের সাথে সাথেই সংগঠনের নেতারা কার্যত উবে গিয়েছেন।
এই দোকানপাট বন্ধ রাখা নিয়ে হকাররা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হকার ফিসফিসিয়ে জানালেন, “মাথার ওপর থেকে হাত সরে গিয়েছে। এখন নতুন শাসকদলের নেতাদের সাথে কথা বলতে হবে। বোঝাপড়া মিটলেই আবার দোকান খুলবে।” অর্থাৎ, এক দলের দাপট শেষ হতেই অন্য দলের সাথে ‘সেটিং’ করার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে তলে তলে।
অন্যদিকে, নিউ মার্কেটের স্থায়ী দোকানদাররা এই হকার উচ্ছেদে বেজায় খুশি। তাঁদের দাবি, “এই হকাররা মার্কেটের গেট ও রাস্তা দখল করে রাখত। কোনো গাড়ি ঢুকতে পারত না, ক্রেতারা আসার জায়গা পেত না। এখন রাস্তা ফাঁকা হওয়ায় আমরা স্বস্তিতে।” সাধারণ পথচারীরাও দীর্ঘদিনের ফুটপাত দখলের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে খুশি প্রকাশ করেছেন। তবে অনেকের মনেই সংশয়—এই স্বস্তি কতদিন স্থায়ী হবে? বর্তমান শাসকদলের সাথে হকারদের রাজনৈতিক বোঝাপড়া হয়ে গেলেই কি ফের পুরোনো ‘দখলদারির’ ছবি ফিরে আসবে? সেই উত্তর সময়ই দেবে। তবে আপাতত কলকাতার বুকে বিজেপির এই ‘বুলডোজার অ্যাকশন’ এবং তৃণমূলের নিষ্ক্রিয়তা বড়সড় পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।





