রক্তহীন বিপ্লব বাংলায়! ‘হয় ঘরে থাকো, নয় শ্রীঘরে’—কারা ছিল কমিশনের টার্গেটে?

কয়েক দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সমার্থক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘হিংসা’ এবং ‘রক্তপাত’। কিন্তু ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে এক অভাবনীয় ইতিহাসের সাক্ষী থাকল বাংলা। রাজ্যের কোথাও একটিও প্রাণহানি হয়নি, ঝরেনি এক ফোঁটা রক্ত। দীর্ঘদিনের সেই চেনা কলঙ্কিত ছবি মুছে দিয়ে নজিরবিহীনভাবে শান্তিপূর্ণ ভোট করিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আর এই অভয় পরিবেশের ফল মিলেছে হাতেনাতে—রাজ্যজুড়ে ভোট পড়েছে ৯০ শতাংশের বেশি, কিছু কেন্দ্রে যা ৯৫ শতাংশও ছাড়িয়ে গেছে। এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্য নায়ক কে? ভোট ও গণনা শেষে নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি উপুড় করলেন নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত।

‘ভয়কে জয় করেছে বাংলার মানুষ’
ভোট পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় এই দুঁদে আইএএস অফিসার স্পষ্ট জানালেন, এবারের শান্তিপূর্ণ নির্বাচন তাঁকে গভীর তৃপ্তি দিয়েছে। সুব্রত বাবুর কথায়, “আমি স্যাটিসফায়েড। নির্বাচনের শুরুতে এবং বিশেষ করে এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে যে ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তাতে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয়েছিল। মানুষ চরম অসুবিধার মধ্যে পড়েছিলেন। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দিতে পারাটা আমাদের কাছে বিরাট সাফল্যের জায়গা।” তিনি মনে করেন, বাংলার নির্বাচনী সংস্কৃতির যে পরিবর্তনের কথা তাঁরা ভেবেছিলেন, তা সাধারণ মানুষ করে দেখিয়েছেন। কমিশনের কড়া সিদ্ধান্ত মানুষের মনে সাহস জুগিয়েছে বলেই রেকর্ড সংখ্যক ভোটার বুথমুখী হয়েছেন।

অসাধু আধিকারিক ও সন্ত্রাসবাদীদের প্রতি কড়া বার্তা
নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে কমিশনের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল পাহাড়প্রমাণ। সুব্রত গুপ্ত স্বীকার করে নেন যে, প্রশাসনের একাংশের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এমনকি কিছু আধিকারিকদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধের অভাবও ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিস্থিতি সামাল দিতে কমিশনকে বেশ কিছু কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। যারা নির্বাচনের সময় গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করেছিল, তাদের জন্য সুব্রত গুপ্তর সেই বিখ্যাত মন্ত্র ছিল— “হয় ঘরে থাকো, নাহলে শ্রীঘরে থাকো।” অর্থাৎ সন্ত্রাসীদের হয় বাড়িতে বসে থাকতে হবে, নয়তো জেলের ঘানি টানতে হবে। এই কড়া অবস্থানের কারণেই এবার দাদাগিরি বা বুথ দখলের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।

আইনি লড়াই ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা
এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে আইনি জটিলতা সুপ্রিম কোর্ট থেকে হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল। সেই সময় প্রশাসনের ওপর সাধারণ মানুষের ভরসা টলমল করে ওঠে। সুব্রত গুপ্ত জানান, “প্রশাসনের মধ্যে নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনাটাই ছিল সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা রাতারাতি সবটা বদলে দিতে না পারলেও, আমলাতন্ত্র ও পুলিশের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। নিরপেক্ষভাবে কাজ না করলে যে রেহাই পাওয়া যাবে না, সেই বার্তাটা নিচুতলা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া গিয়েছিল।” সব মিলিয়ে, নির্বাচন কমিশনের পেশাদারিত্ব এবং বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক চেতনার জয় হলো এই নির্বাচনে।