“অহংকার না কি দুর্নীতি?”-জেনেনিন কোন অভিশাপে হারলেন উদয়ন-পরেশ?

২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বাংলা জুড়ে বইছে পরিবর্তনের ঝড়। আর সেই ঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরবঙ্গের শাসক শিবির। শিলিগুড়ি থেকে মালদা— সর্বত্রই যখন ‘হেভিওয়েট’ পতনের মেলা, তখন কোচবিহারের দুই দাপুটে নেতা উদয়ন গুহ এবং পরেশ অধিকারীর হার সবথেকে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উদ্ধত আস্ফালন আর দুর্নীতির কলঙ্কই কাল হলো এই দুই প্রাক্তন বাম নেতার।

দিনহাটায় স্তব্ধ উদয়নের গর্জন: কাল হলো নিজেরই ‘জিভ’?

দিনহাটার নিজের গড়ে শেষরক্ষা করতে পারলেন না উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী উদয়ন গুহ। বিজেপির অজয় রায়ের কাছে ১৭,৪৭৭ ভোটের ব্যবধানে পরাস্ত হলেন তিনি। অজয়বাবু পেয়েছেন ১,৩৮,২৫৫ ভোট, সেখানে উদয়নবাবু আটকে গিয়েছেন মাত্র ১,২০,৮০৮ ভোটে।

কেন এই পতন? রাজনৈতিক মহলের মতে, উদয়নবাবুর বেলাগাম মন্তব্যই ভোটারদের মনে বিষিয়ে দিয়েছিল। পৃথক রাজ্যের দাবি তুললে ‘হাত-পা ভেঙে দেওয়ার’ হুমকি থেকে শুরু করে আরজি কর আবহে মহিলাদের প্রতি ‘স্বামী মারলে আমায় ফোন করবেন না’—র মতো বিতর্কিত মন্তব্য মানুষ সহজভাবে নেয়নি। এছাড়া নিজের ভাইপো জয় গুহর তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া ছিল তাঁর হারের এক বড় আগাম সংকেত।

মেখলিগঞ্জে ‘অঙ্কিতা-কাঁটা’: পরেশকে ডোবাল নিয়োগ দুর্নীতি

মেখলিগঞ্জ বিধানসভায় বিজেপির দধিরাম বর্মণের কাছে ২৯,৫৮৪ ভোটের বিশাল ব্যবধানে ধরাশায়ী হলেন প্রাক্তন মন্ত্রী পরেশ অধিকারী। পরেশবাবুর হারের কারণ খুঁজতে খুব বেশি গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। মেখলিগঞ্জের সাধারণ মানুষ ভোলেননি মন্ত্রী থাকাকালীন নিজের মেয়ে অঙ্কিতাকে প্রভাব খাটিয়ে বেআইনিভাবে শিক্ষিকার চাকরি পাইয়ে দেওয়ার সেই কলঙ্কিত ইতিহাস।

হাইকোর্টের নির্দেশে মেয়ের চাকরি যাওয়া এবং বেতন ফেরতের ঘটনা পরেশবাবুর স্বচ্ছ ভাবমূর্তিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল। সিবিআই-ইডি-র হাজিরা আর নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে জেরবার এই নেতার ওপর আর ভরসা রাখতে পারেনি আমজনতা।

উত্তরবঙ্গের ডেমোগ্রাফি ও রাজবংশী আবেগ

শুধু উদয়ন বা পরেশ নন, উত্তরবঙ্গে হারের মুখ দেখতে হয়েছে গৌতম দেব ও মৌসম নূরের মতো প্রথিতযশা নেতাদেরও। কিন্তু কোচবিহারের এই দুই হেভিওয়েটের হার আলাদা তাৎপর্য বহন করছে। বিজেপি যেভাবে রাজবংশী আবেগ আর তৃণমূলের শীর্ষস্তরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে হাতিয়ার করেছে, তাতে খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছে তৃণমূলের সংগঠন।

নিচুতলার কর্মীদের ক্ষোভ আর দুর্নীতির কালিমায় ঢাকা পড়া নেতাদের টিকিট দেওয়াটাই যে তৃণমূলের বড় ভুল ছিল, তা আজকের ফলাফলই প্রমাণ করে দিচ্ছে। এই বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলে কোচবিহারে ঘাসফুল ফের কবে ডালপালা মেলতে পারবে, এখন সেটাই বড় প্রশ্ন।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy