২০৩০-এ শেষ হবে জল? ইথানল বিপ্লবের আড়ালে ঘনিয়ে আসছে চরম জলসঙ্কট, মাথায় হাত আমজনতার!

দেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সঙ্কট মেটাতে এবং পরিবেশ দূষণ কমাতে পেট্রোলের সাথে ইথানল মেশানোর পথে হাঁটছে কেন্দ্র সরকার। ‘ক্লিন এনার্জি’ বা স্বচ্ছ শক্তির এই লক্ষ্য আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হলেও, মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখাচ্ছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের দাবি, জ্বালানি বাঁচাতে গিয়ে আমরা অজান্তেই দেশের অমূল্য জলসম্পদ শেষ করে ফেলছি। পরিবেশ রক্ষার এই প্রজেক্টই এখন ভারতের আসন্ন জলসঙ্কটকে আরও ত্বরান্বিত করছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কেন বিপদের মুখে দেশের জলস্তর?
জ্বালানি খাতে স্বনির্ভর হতে ইথানল উৎপাদনের জন্য মূলত ধান, আখ ও ভুট্টার মতো ফসলের ওপর নির্ভর করতে হয়। আইপিসিসি-র (IPCC) লেখক ডঃ অঞ্জল প্রকাশের মতে, “ইথানলের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত আখ এবং ভুট্টা চাষ ও প্রক্রিয়াজাত করতে বিপুল পরিমাণ জলের প্রয়োজন। ভারতের মতো দেশে যেখানে এমনিতেই ভূগর্ভস্থ জলস্তর নিচের দিকে, সেখানে এই প্রক্রিয়া বিপদ আরও বাড়াবে।”

চমকে দেওয়ার মতো পরিসংখ্যান
২০২৪ সালে দিল্লিতে আয়োজিত একটি গ্লোবাল কনফারেন্সে খাদ্য সচিব সঞ্জীব চোপড়া ইথানল উৎপাদনের যে হিসাব দিয়েছেন, তা রীতিমতো পিলে চমকে দেওয়ার মতো। ১ লিটার ইথানল তৈরিতে কত জল লাগে জানেন?

ধান থেকে: প্রায় ১০,৭৯০ লিটার।

ভুট্টা থেকে: প্রায় ৪,৬৭০ লিটার।

আখ থেকে: প্রায় ৩,৬৩০ লিটার।

সাধারণত ১ কেজি ধান চাষে ৩ থেকে ৫ হাজার লিটার জল লাগে। আর ১ লিটার ইথানল বানাতে প্রয়োজন হয় প্রায় ৩ কেজি চাল। ফলে সামগ্রিক ‘ওয়াটার ফুটপ্রিন্ট’ ১০ হাজার লিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ এত বিপুল জল খরচ করে এক টন চাল থেকে মাত্র ৪৭০ লিটারের মতো ইথানল পাওয়া যায়।

শিল্প বনাম কৃষি: বৈষম্যের প্রশ্ন
এই প্রেক্ষাপটে বড়সড় প্রশ্ন তুলেছেন ‘কিষান তক’-এর এডিটর ওম প্রকাশ। তিনি জানান, একজন কৃষক যখন ১ কেজি চাল চাষ করেন, তখন তাকে প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্টের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু শিল্পক্ষেত্রে যখন ১ লিটার জ্বালানির জন্য ১০ হাজার লিটার জল অপচয় হয়, তখন কেন সবাই চুপ? শুধু জল অপচয়ই নয়, ইথানল মিলগুলো থেকে বের হওয়া বর্জ্য জল (ভিনাস) যদি সঠিকভাবে শোধন না করা হয়, তবে তা নদী ও ভূগর্ভস্থ জলকেও বিষিয়ে তুলতে পারে।

২০৩০-এ কি তবে শূন্য হবে জলস্তর?
নীতি আয়োগের ‘কম্পোজিট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনডেক্স’ (CWMI) আগেই সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাদের দাবি, ২০৩০ সালের মধ্যে দিল্লি, বেঙ্গালুরু এবং চেন্নাইয়ের মতো ২১টি প্রধান শহরের ভূগর্ভস্থ জলস্তর শূন্যে নেমে আসতে পারে।

বর্তমানে ভারতের ইথানল উৎপাদনের সিংহভাগ হয় মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ ও কর্ণাটকের মতো রাজ্যে। অথচ মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ বা মারাঠওয়াড়ার কৃষকরা ইতিমধ্যেই খরায় ধুঁকছেন। সেখানে ৩৯৬ কোটি লিটার উৎপাদন ক্ষমতার ইথানল প্ল্যান্ট চালানো কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে জোরালো হচ্ছে বিতর্ক। জ্বালানি বিপ্লবের নেশায় দেশ কি তবে তৃষ্ণার্ত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? উত্তর এখন সময়ের হাতে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy