‘জীবন ও স্বাধীনতার অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন’! দোষী না হয়েও লক্ষ লক্ষ মানুষ বছরের পর বছর জেলে, বিচার ব্যবস্থার করুণ চিত্র

ভারতের বিচার ব্যবস্থার গভীর সংকট নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বিক্রম নাথ। শুক্রবার একটি জাতীয় আইনি সাহায্য সম্মেলনে তিনি জানান, দেশের মোট কারাবন্দিদের প্রায় ৭০ শতাংশ এখনও কোনও আদালতে দোষী সাব্যস্ত হননি। এই সংখ্যাটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, বিচারপতি নাথের মতে, এটি “আমাদের বিচার ব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন।”
অনুচ্ছেদ ২১-এর সরাসরি লঙ্ঘন
বিচারপতি বিক্রম নাথ জানান, দেশে মোট কারাবন্দি প্রায় ৪.৩৪ লাখের মধ্যে ৩.০৮ লাখই হলো ‘আন্ডারট্রায়াল’ (যাদের মামলা এখনও চলছে)। তিনি এই পরিস্থিতিকে সাংবিধানিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন।
“একজন মানুষ যদি দোষী না হয়েও ৫-৭ বছর জেলে থাকে, তাহলে সে তার জীবনের সেরা সময় হারিয়ে ফেলে। এটা সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের (জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার) সরাসরি লঙ্ঘন।”
তিনি উল্লেখ করেন, দেশের বড় কারাগারগুলোতে (যেমন তিহার জেল, আরথার রোড জেল) আন্ডারট্রায়ালদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
সংকটের মূলে ৩টি প্রধান কারণ
বিচারপতি নাথ এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে তিনটি প্রধান সমস্যা:
১. আইনি সাহায্যের অভাব: জাতীয় আইনি সেবা কর্তৃপক্ষের (নালসা) মতে, দেশে মাত্র ৬৫,০০০ প্যানেল আইনজীবী আছেন, যা ১.৪ বিলিয়ন জনসংখ্যার জন্য যথেষ্ট নয়। গ্রামীণ এলাকায় আইনি সাহায্য প্রায় অস্তিত্বহীন। ২. বিচারকের অভাব: সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ডি.ওয়াই. চন্দ্রচূড় গত মাসে জানিয়েছেন, নিম্ন আদালতে বিচারকের পদ ২৫ শতাংশ খালি, যার কারণে ৪০ লক্ষের বেশি মামলা আটকে আছে। ৩. পুলিশি তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতা: অনেক মামলায় চার্জশিট দাখিলে বছর লেগে যায়। (যদিও মালিমাথ কমিটির সুপারিশ ছিল ১৮০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার)।
দরিদ্রের দুর্ভোগের গল্প
এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে রাকেশ কুমারের (পটনার দিনমজুর, ৫ বছর ধরে চুরির মামলায় জেলে) মতো লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের গল্প। তাঁর স্ত্রী মীনা দেবী বলেন, “আমার স্বামীকে কোনও আইনজীবী দেওয়া হয়নি। আমরা গরিব, কীভাবে লড়ব?” এই দুর্দশা সমাজের দরিদ্র, দলিত, আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রকট।
জরুরি সংস্কারের আহ্বান
বিচারপতি নাথ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে বেশ কিছু সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন:
লিগ্যাল এইড ক্লিনিক: প্রতিটি জেলায় ২৪ ঘণ্টা আইনজীবী উপলব্ধ রেখে ‘লিগ্যাল এইড ক্লিনিক’ স্থাপন।
ইউআরসি সক্রিয়করণ: আন্ডারট্রায়াল রিভিউ কমিটিগুলোকে (URCs) আরও সক্রিয় করে প্রতি তিন মাসে বৈঠকে বসা, যাতে জামিনযোগ্য অপরাধে আটক ব্যক্তিদের মুক্তির সুপারিশ করা যায়।
CrPC 436A প্রয়োগ: তিনি বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৩৬এ ধারা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলে ৫০ শতাংশ আন্ডারট্রায়াল জামিনে মুক্তি পেতে পারেন।