স্বপ্নাদেশ পেয়ে বন্ধ হয়নি পুজো! আগুনে ভস্মীভূত হওয়ার পর থেকেই এই পোড়া রূপেই পূজিত হন মা দুর্গা

শুভ ষষ্ঠীর সকাল থেকেই মেতে উঠেছে ক্যানিং ভট্টাচার্য বাড়ির সদস্যরা। আর পাঁচটা বনেদি বাড়ির পুজোর থেকে ক্যানিংয়ের এই পুজো সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ এখানে দেবী দুর্গা পূজিত হন ‘পোড়া মুখ’ নিয়ে। দেবীর সারা শরীরও ঝলসানো তাম্রবর্ণের। শুধু তাই নয়, এখানে দেবী দুর্গার ডানদিকের পরিবর্তে বাঁ-দিকে থাকেন গণেশ। পূর্ববঙ্গের ঢাকার বিক্রমপুর বাইনখাঁড়া গ্রামে ৪৩৮ বছর আগে শুরু হওয়া এই পুজো এ বছর ৪৪১ তম বর্ষে পদার্পণ করেছে।
পোড়া দুর্গাপুজোর ইতিহাস: স্বপ্নাদেশেই বদল রূপের
প্রায় ৪৪১ বছর আগে বাংলাদেশে এই ভট্টাচার্যদের বংশধররা জমিদার বাড়ির আভিজাত্য প্রদর্শনের জন্য এই পুজো শুরু করেছিলেন। পুজো শুরুর শতাধিক বছর পর এই বাড়িতে ঘটে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
পরিবারের সদস্যদের কথায়, একদিন মনসা পূজো করে পুরোহিত দুর্গা পুজো করতে এলে একটি কাক মনসা মন্দিরের ঘিয়ের প্রদীপের পলতে নিয়ে উড়ে যায়। সেই পলতে দুর্গা মন্দিরের শনের চালে পড়ে গেলে আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায় দুর্গা দালান এবং প্রতিমা পুড়ে যায়।
এরপর পুজো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। কিন্তু একদিন রাতে তৎকালীন গৃহকর্তা রামকান্ত ভট্টাচার্য স্বপ্নাদেশ পান— দেবী দুর্গা নির্দেশ দেন যে তাঁর পুজো যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়, বরং তাঁর ঐ পোড়া রূপেই যেন তাঁকে পুজো করা হয়। সেই স্বপ্ন পাওয়ার পর থেকেই আজও দেবীর সেই পোড়া মুখ ও ঝলসানো শরীরের মূর্তিতেই বছরের পর বছর ধরে দুর্গাপূজা চলে আসছে।
গণেশ কেন বাঁ-দিকে?
এই বাড়ির দুর্গা প্রতিমার আরও একটি বিশেষত্ব হলো, এখানে গণেশ দেবীর ডান পাশের পরিবর্তে বাম পাশে থাকেন। পরিবারের সদস্য পীযূষ ভট্টাচার্য এই রীতির কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন:
“পুরানে কথিত আছে গণেশ বড় না কার্ত্তিক বড় এ নিয়ে মা দুর্গার দুই সন্তানের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়েছিল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডকে আগে ঘুরে আসতে পারে তা নিয়ে। কার্ত্তিক নিজের বাহন ময়ূরে করে তৎক্ষণাৎ রওনা দেন। কিন্তু গণেশ নিজের মাকেই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড মনে করে মাকে প্রদক্ষিণ করে মায়ের বাম দিকে স্থান নেয়। আমরাও সেই কারণে আমাদের পুজোতে গণেশ ও কার্তিকের জায়গা অদল বদল করেছি। বছরের পর বছর এই রীতি মেনেই পুজো হয়।”
জন্মাষ্টমী তিথিতে কাঠামো পুজোর মধ্যে দিয়ে এই বাড়ির দুর্গাপূজা শুরু হয়। জাঁকজমকে কিছুটা ভাঁটা পড়লেও, বাংলাদেশ থেকে শুরু করে আজ অবধি একই কাঠামোয় পুজো চলছে। শুধু ক্যানিং নয়, দূর দূরান্ত থেকেও বহু মানুষ এই বিরল প্রতিমা দর্শন করতে আসেন।