অঙ্গদানই জীবনের শেষ ইচ্ছা, প্রাক্তন স্বাস্থ্য অধিকর্তার প্রয়াণে লিভার ও কিডনি পেলেন দুই রোগী

মৃত্যুর পরও জীবন দিয়ে গেলেন রাজ্যের প্রাক্তন স্বাস্থ্য অধিকর্তা সঞ্চিতা বকসি। ৭৬ বছর বয়সে অঙ্গদানের মাধ্যমে তিনি রাজ্যের প্রবীণতম অঙ্গদাতা হিসেবে নজির স্থাপন করলেন। জীবদ্দশায় অঙ্গদানের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার যে চেষ্টা তিনি করতেন, মৃত্যুর পর তা যেন পূর্ণতা পেল। তার অঙ্গদানের মাধ্যমে দুজন রোগী নতুন জীবন পেলেন এবং তার কর্নিয়াও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর রাতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের (ব্রেনস্ট্রোক) কারণে সঞ্চিতা বকসিকে মুকুন্দপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দু’দিন পর, অর্থাৎ ১১ সেপ্টেম্বর তার ‘ব্রেন ডেথ’ ঘোষণা করা হয়। তবে তার কানাডায় থাকা ছোট মেয়ের ইচ্ছায় আরও দু’দিন তাকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল।
অঙ্গদান ও প্রতিস্থাপন
পরিবারের সম্মতিতে গত ১৩ সেপ্টেম্বর সঞ্চিতা বকসির একাধিক অঙ্গদান করা হয়। সেই রাতেই তার লিভার ও কিডনি দুজন রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। তার লিভার পেয়েছেন এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৪৮ বছরের এক পুরুষ, আর কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়েছে ৪৯ বছরের এক মহিলার শরীরে, যিনি মুকুন্দপুরের ওই একই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বর্তমানে এই দুজন রোগীই সুস্থ আছেন।
সঞ্চিতা বকসির বড় মেয়ে অনিন্দিতা বকসি জানান, “আমার মা অঙ্গদানে ইচ্ছুক ছিলেন। তিনি চাকরিজীবনেও এই ধরনের অনুষ্ঠানে সবসময় উপস্থিত থাকতেন। মাকে আমরা হারাচ্ছি, কিন্তু এতগুলো মানুষের মধ্যে আমরা মাকে ধরে রাখব।”
একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের জীবনবৃত্তান্ত
সঞ্চিতা বকসি প্রায় তিন দশক ধরে রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য দফতরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়ার মতো জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ নিয়ে দীর্ঘকাল কাজ করেছেন। ২০০৬ সালের নভেম্বরে তিনি রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তা পদে নিযুক্ত হন এবং ২০০৯ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই দায়িত্বে ছিলেন। তার সময়ে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে নেওয়া উদ্যোগগুলি বেশ প্রশংসিত হয়েছিল।
সারা দেশে অঙ্গদানের প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের অধীনে থাকা ন্যাশনাল অরগ্যান অ্যান্ড টিস্যু ট্রান্সপ্ল্যান্ট অরগানাইজেশন (NOTTO)-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সঞ্চিতা বকসির অঙ্গদানের বিষয়টিও এই সংস্থার মাধ্যমে হয়েছে। এই সংস্থাটিই নিশ্চিত করেছে যে এর আগে পশ্চিমবঙ্গে এত বেশি বয়সের কোনো ব্যক্তির অঙ্গদান করা হয়নি, যা সঞ্চিতা বকসিকে রাজ্যের প্রবীণতম অঙ্গদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার এই অঙ্গদান একইসঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং মানবতাকে এক নতুন বার্তা দিল।