কামচাটকায় ৮.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, রিং অফ ফায়ারের সতর্কতা ও বৈশ্বিক সুনামির শঙ্কা

গতকাল, ৩০শে জুলাই, রাশিয়ার কামচাটকা উপদ্বীপের কাছে এক বিশাল প্রাকৃতিক বিপর্যয় আঘাত হেনেছে। পেট্রোপাভলভস্ক-কামচাটস্কি শহর থেকে প্রায় ১১৯ কিলোমিটার দূরে, ভূপৃষ্ঠের ২০ কিলোমিটার গভীরে ৮.৮ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। ‘দ্য কনভারসেশন’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুসারে, এটি আধুনিক ইতিহাসে নথিভুক্ত হওয়া দশটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের মধ্যে অন্যতম এবং ২০১১ সালের পর বিশ্বজুড়ে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। এই প্রলয়ঙ্করী কম্পনে ভবনগুলিতে ফাটল দেখা গেছে, বহু মানুষ আহত হয়েছেন এবং দ্রুত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।

বিশ্বজুড়ে সুনামি সতর্কতা:

ভূমিকম্পের পরপরই রাশিয়া, জাপান এবং হাওয়াইতে দ্রুত সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। এছাড়াও, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, নিউজিল্যান্ড এবং এমনকি সুদূর পেরুতেও সম্ভাব্য সুনামির বিষয়ে পরামর্শ পাঠানো হয়েছে। বড় ঢেউয়ের আশঙ্কায় উপকূলীয় অঞ্চলগুলো থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা প্রশান্ত মহাসাগরের চারপাশে ঘোড়ার খুরের আকৃতির একটি সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল ‘রিং অফ ফায়ার’-এর অংশ হওয়ার কারণেই ঘটেছে। এই অঞ্চলে অসংখ্য ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে থাকে। ‘দ্য কনভারসেশন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আধুনিক ইতিহাসের দশটি শক্তিশালী ভূমিকম্পই এই বিপজ্জনক অঞ্চলেই সংঘটিত হয়েছে।

কেন কামচাটকায় এত বড় ভূমিকম্প হয়?

কামচাটকা উপদ্বীপ ‘কুরিল-কামচাটকা ট্রেঞ্চ’ নামক একটি প্রধান ভূতাত্ত্বিক ফল্ট লাইনের কাছে অবস্থিত। এখানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেটটি ওখটস্ক প্লেটের নীচে প্রবেশ করে, যা একটি ‘সাবডাকশন জোন’ তৈরি করে। এই প্লেটগুলি মসৃণভাবে চলাচল করে না; বরং, প্রায়শই তারা ‘আটকে’ যায় এবং প্রবল চাপ তৈরি হয়। যখন এই চাপ অত্যাধিক হয়ে যায়, তখন তা একটি বিশাল ভূমিকম্পের আকারে মুক্তি পায়। বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেছেন, “প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেট এখানে প্রতি বছর প্রায় ৭৫ মিমি সরে যায়, যা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অত্যন্ত দ্রুত। এই কারণেই কামচাটকায় বড় ভূমিকম্প বেশি হয়।” উল্লেখ্য, ১৯৫২ সালে এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে মাত্র ৩০ কিমি দূরেই ৯.০ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল।

অতীতের ভয়াবহ ভূমিকম্পের সঙ্গে তুলনা:

বর্তমান এই ভূমিকম্প অতীতের কিছু মারাত্মক ভূমিকম্পের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যেমন:

২০১১ সালের জাপানের তোহোকু-ওকি ভূমিকম্প (৯.১ মাত্রা)

২০০৪ সালের ইন্দোনেশিয়ার কাছে বক্সিং ডে ভূমিকম্প (৯.৩ মাত্রা)

এই পূর্ববর্তী ভূমিকম্পগুলি সমুদ্রতলের বিশাল অংশ সরিয়ে দেওয়ার কারণে বিশাল সুনামির সৃষ্টি করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, বক্সিং ডে ভূমিকম্প সমুদ্রতলকে ১,৪০০ কিলোমিটারেরও বেশি স্থানচ্যুত করেছিল, যার ফলে অনেক দেশে বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়েছিল এবং ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছিল।

কামচাটকা ভূমিকম্প এবং আফটারশক:

ভূমিকম্পের ছয় ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ ৫.০ মাত্রার উপরে ৩৫টিরও বেশি আফটারশক রেকর্ড করেছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, এর মধ্যে কিছু আফটারশক ৭.৫ মাত্রার মতো শক্তিশালী হতে পারে এবং এগুলি সপ্তাহ বা মাস ধরে চলতে পারে। কামচাটকা, জাপান এবং কুরিল দ্বীপপুঞ্জের উপকূলীয় এলাকায় ইতিমধ্যেই ছোট ছোট সুনামির ঢেউ দেখা গেছে। আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাওয়াই, চিলি এবং পেরুর মতো দূরবর্তী স্থানেও বড় ঢেউ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং নতুন তথ্য আসার সঙ্গে সঙ্গে সুনামি মডেলগুলো আপডেট করছেন। স্থানীয় নাগরিক প্রতিরক্ষা দলগুলো সতর্কতা জারি করে মানুষকে নিরাপদ থাকতে সাহায্য করছে।

শিক্ষণীয় বিষয়:

রাশিয়ার এই বিশাল ভূমিকম্প অনেক দেশের সামনে লুকিয়ে থাকা প্রাকৃতিক ঝুঁকির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যদিও এত বড় ভূমিকম্প বিরল, কিন্তু তাদের প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর এবং বিশ্বব্যাপী হতে পারে। উল্লেখযোগ্য যে, মাত্র দশ দিন আগে, ২০শে জুলাই, একই অঞ্চলে ৭.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। বিজ্ঞানীরা এখন গবেষণা করছেন যে, সেই ভূমিকম্প এই বিশাল ভূমিকম্পের সূত্রপাতে কোনো ভূমিকা রেখেছিল কিনা। ‘দ্য কনভারসেশন’-এর প্রবন্ধে সতর্ক করা হয়েছে যে, সাবডাকশন জোনযুক্ত অন্যান্য অঞ্চলগুলিরও এই ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, নিউজিল্যান্ড দুটি সাবডাকশন জোনের উপর অবস্থিত, যার মধ্যে ‘হিকুরাঙ্গি ট্রেঞ্চ’ অন্যতম। যদিও সাম্প্রতিক অতীতে এটি কোনো বড় ভূমিকম্প সৃষ্টি করেনি, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ভবিষ্যতে এটি ৯ মাত্রার ভূমিকম্প এবং সুনামি সৃষ্টি করতে পারে।