আমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনায় মায়ের আত্মত্যাগ! ‘স্কিন গ্রাফটিংয়ে’ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরল ‘কনিষ্ঠতম যোদ্ধা’

আমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনায় মায়ের আত্মত্যাগ: ৮ মাসের শিশুর জীবন বাঁচল স্কিন গ্রাফটিংয়ে, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরল ‘কনিষ্ঠতম যোদ্ধা’
আমেদাবাদ, ২৯শে জুলাই, ২০২৫: গত ১২ই জুন গুজরাটের আমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার লন্ডনগামী বিমানের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণে বাঁচা কনিষ্ঠতম ৮ মাসের শিশু ধায়াংশ অবশেষে বিপন্মুক্ত। দীর্ঘ দেড় মাসের কঠিন লড়াইয়ের পর সে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে এই অলৌকিক টিকে থাকার নেপথ্যে রয়েছে তার মায়ের অসীম সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগ, যা গোটা ঘটনাটিকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।

গত ১২ই জুন আমেদাবাদের BJ Medical College-এর হস্টেলের দেওয়ালে ধাক্কা মেরে ভেঙে পড়ে এয়ার ইন্ডিয়ার IC 171 বিমানটি। এই দুর্ঘটনায় বিমানে সওয়ার ২৪১ জন যাত্রী এবং লোকালয়ে আরও অনেকে প্রাণ হারান। সেই ধ্বংসলীলার মাঝখান থেকে মৃত্যু মুখে পড়েও বেঁচে ফেরে কনিষ্ঠতম যাত্রী ধায়াংশ।

ধায়াংশের বাবা কপিল কাছাড়িয়া, যিনি ওই মেডিক্যাল কলেজের ইউরোলজি বিভাগের ছাত্র এবং হস্টেলেই থাকতেন, দুর্ঘটনার সময় হাসপাতালে ডিউটিতে ছিলেন। হস্টেলেই শিশুসন্তান ধায়াংশকে নিয়ে উপস্থিত ছিলেন মা মনীষা। সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কপিল জানিয়েছেন, বিমান বিধ্বস্ত হলে মনীষাও গুরুতর আহত হন। কিন্তু তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল কোলের সন্তানকে বাঁচানো। আগুনের লেলিহান শিখা যখন গা পোড়াচ্ছিল এবং ধোঁয়ায় চারদিক অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, তখন মনীষা নিজের শরীর দিয়ে ছেলেকে ঢাল করে আড়াল করেন, যেন তার উপর আগুনের তাপ না লাগে।

মনীষা স্মৃতিচারণ করে বলেন, দুর্ঘটনার পর ঘর যখন তেতে উঠছিল, তিনি ছেলেকে নিয়ে দৌড়ে বেরোতে চেষ্টা করেন। কিন্তু আগুনের ছ্যাঁকা লাগছিল শরীরে, আর ঘন ধোঁয়ায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আগুনের তাপ তাঁর এবং ছোট্ট ধায়াংশের শরীরেও লেগেছিল। মনীষা জানান, তিনি বেঁচে ফিরবেন বলে ভাবতেই পারেননি, কিন্তু ছেলের কথা ভেবেই জীবন বাজি রেখে দৌড়েছিলেন। সেই শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জানা গেছে, বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর আগুনের তাপে মনীষার শরীরের ২৫ শতাংশ পুড়ে যায়, তাঁর হাত ও মুখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, ছোট্ট ধায়াংশের শরীরের ৩৬ শতাংশ পুড়ে যায়, তার মাথা, হাত, বুক এবং পেটের ত্বক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দুর্ঘটনার পর মা ও ছেলেকে কেডি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ধায়াংশকে পিসিআইইউ (PCIU)-তে রাখা হয় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস সচল রাখার জন্য ভেন্টিলেটরে রাখা হয়েছিল। তাকে আইভি (IV) ফ্লুইড এবং রক্ত দেওয়া হয় এবং চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।

চিকিৎসকরা জানান, ছোট্ট ধায়াংশের বয়স অত্যন্ত কম হওয়ায় তার পরিস্থিতি বেশ জটিল আকার ধারণ করেছিল। তার ক্ষত সারানোর জন্য স্কিন গ্রাফটিং (ত্বক প্রতিস্থাপন)-এর প্রয়োজন ছিল। এই পরিস্থিতিতে আবারও ঢাল হয়ে এগিয়ে আসেন মা মনীষা। তিনি নিজের ত্বক ছেলেকে দান করেন, যা ধায়াংশের জীবন বাঁচানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কেডি হাসপাতালের ম্যানেজিং ডিরেক্টর অদিত দেসাই জানিয়েছেন, মায়ের অসীম সাহস এবং আত্মত্যাগের জন্যই সন্তান রক্ষা পেল। তিনি আরও জানান, হাসপাতালের সকল কর্মী শিশুটির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন। প্লাস্টিক সার্জন রুতবিজ পারেখ বলেন, পোড়ার ক্ষত সারাতে শিশুর শরীরে মায়ের ত্বক সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং সংক্রমণের বিষয়েও তাঁরা সতর্ক ছিলেন। বর্তমানে মনীষা স্থিতিশীল আছেন এবং ধায়াংশও সম্পূর্ণ সুস্থ। গত সপ্তাহেই তাদের হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হয়েছে।

স্ত্রীর এবং ছেলের সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরায় কপিলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, মাঝরাতে উঠেও তিনি তাদের ড্রেসিং করতেন। দুর্ঘটনার তীব্রতায় ধায়াংশের ফুসফুসের একদিকে রক্ত জমা হয়েছিল, যার জন্যই তাকে পাঁচ সপ্তাহ ধরে ভেন্টিলেটরে রাখতে হয়েছিল। চিকিৎসকরাও একমত যে, মা মনীষার আত্মত্যাগ এবং অদম্য লড়াইয়ের ফলেই ছোট্ট ধায়াংশ এই জীবন-মৃত্যুর যুদ্ধ জয় করতে পেরেছে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy