বেড়াতে গিয়ে আলিশান হোটেলের নরম বিছানা হোক বা আত্মীয়ের বাড়ির আরামদায়ক ঘর— জায়গাটা নতুন হলেই যেন রাতের ঘুম মাথায় ওঠে। অনেকে একে ‘জায়গা বদল’ বলে হালকাভাবে নিলেও বিজ্ঞানীরা একে বলছেন একটি বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, যার নাম ‘ফার্স্ট নাইট এফেক্ট’ (First-Night Effect)। কেন এমন হয়? উত্তরটা আমাদের বিবর্তন এবং মস্তিষ্কের এক অদ্ভুত কৌশলের মধ্যে লুকিয়ে আছে।
মস্তিষ্কের ‘নাইট ওয়াচম্যান’ মোড:
আমেরিকার ব্রাউন ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, যখন আমরা কোনো অচেনা জায়গায় ঘুমাতে যাই, তখন আমাদের মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেয় না। সামুদ্রিক প্রাণী যেমন ডলফিন বা তিমির মতো আমাদের মস্তিষ্কের একটি গোলার্ধ (Hemisphere) তখন ‘নাইট ওয়াচম্যান’ বা পাহারাদারের ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ, আপনার ডান দিকের মস্তিষ্ক গভীর ঘুমে থাকলেও বাম দিকের অংশটি হালকা সজাগ থাকে কোনো সম্ভাব্য বিপদের সংকেত পাওয়ার জন্য।
বিবর্তনের সেই আদিম খেলা:
হাজার হাজার বছর আগে আদিম মানুষ যখন গুহায় বা বনে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাত, তখন নতুন কোনো জায়গায় বন্যজন্তুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে তাদের মস্তিষ্ক এই পদ্ধতি রপ্ত করেছিল। আজকের দিনে কোনো উন্নত মানের রিসোর্টে শুয়েও আমাদের অবচেতন মন সেই আদিম সংস্কার ভুলতে পারে না। নতুন জায়গা মানেই মস্তিষ্কের কাছে সেটি একটি ‘অচেনা বিপদসংকুল পরিবেশ’।
নতুন জায়গায় ঘুম না আসার কিছু বিশেষ লক্ষণ:
সামান্য শব্দেই হড়বড় করে ঘুম ভেঙে যাওয়া।
তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব থাকলেও গভীর ঘুমের অভাব।
সকালে ওঠার পর শরীর ম্যাজম্যাজ করা বা ক্লান্তি অনুভব করা।
কীভাবে এই সমস্যা কাটাবেন?
বিজ্ঞানীরা এবং ট্রাভেল বিশেষজ্ঞরা এই ‘ফার্স্ট নাইট এফেক্ট’ কাটানোর কিছু সহজ উপায় দিয়েছেন:
১. চেনা গন্ধ সঙ্গে রাখুন: নিজের বালিশের কভার বা প্রিয় চাদর সাথে নিয়ে যেতে পারেন। পরিচিত গন্ধ মস্তিষ্ককে নিরাপদ থাকার সংকেত দেয়।
২. শোবার রুটিন এক রাখুন: বাড়িতে ঘুমানোর আগে যদি বই পড়া বা গান শোনার অভ্যাস থাকে, নতুন জায়গাতেও ঠিক তাই করুন।
৩. হোয়াইট নয়েজ ব্যবহার করুন: ফ্যান বা মৃদু মিউজিকের শব্দ বাইরের অচেনা আওয়াজকে ঢেকে দেয়, ফলে মস্তিষ্ক সজাগ হওয়ার সুযোগ কম পায়।
উপসংহার:
অচেনা জায়গায় রাতে ঘুম না আসাটা আসলে আপনার মস্তিষ্কের আপনাকে রক্ষা করার একটি পদ্ধতি। তাই পরের বার ভ্রমণে গিয়ে প্রথম রাতে ঘুম না হলে বিরক্ত হবেন না; বরং ভাবুন আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে পাহারা দিচ্ছে! সাধারণত দ্বিতীয় রাত থেকে মস্তিষ্ক নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেয় এবং ঘুম স্বাভাবিক হয়ে যায়।





