সন্তান জন্মের পর মায়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু জানেন কি, এই একই সময়ে নিঃশব্দে এক লড়াই লড়েন বাবারাও? চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘প্যারেন্টাল পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন’ (Paternal Postpartum Depression)।
গবেষণা বলছে, প্রতি ১০ জন নতুন বাবার মধ্যে ১ জন এই ধরণের গুরুতর মানসিক অবসাদে ভোগেন। অথচ আমাদের সমাজে ‘পুরুষদের কাঁদতে নেই’—এই ধারণা থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিষয়টি অজানাই থেকে যায়। কেন সন্তান জন্মের পর বাবারা অবসাদে ভোগেন? রইল বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ:
১. হরমোনের পরিবর্তন:
অবাক হলেও সত্যি, সন্তান জন্মের সময় পুরুষদের শরীরেও হরমোনের তারতম্য ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন বাবাদের শরীরে ‘টেস্টোস্টেরন’ হরমোনের মাত্রা কমে যায় এবং ‘ইস্ট্রোজেন’ ও ‘প্রোল্যাকটিন’ বেড়ে যেতে পারে, যা মেজাজের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
২. আর্থিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা:
একটি নতুন প্রাণ আসার সাথে সাথেই বাড়ে খরচ। পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখা, বাচ্চার পড়াশোনা—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মানসিক চাপ তৈরি হয়। এই বাড়তি দায়িত্বের ভয় থেকেই অনেক সময় অবসাদ দানা বাঁধে।
৩. ঘুমের অভাব ও ক্লান্তি:
বাচ্চার কান্নায় মায়েদের মতো বাবাদেরও রাতের পর রাত জেগে থাকতে হয়। একটানা ঘুমের অভাব বা ‘স্লিপ ডিপ্রাইভেশন’ মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে তোলে, যা থেকে খিটখিটে মেজাজ এবং বিষণ্ণতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
৪. একাকীত্ব ও মনোযোগের অভাব:
সন্তান আসার পর বাড়ির সবার মনোযোগ বাচ্চার দিকে চলে যায়। সঙ্গিনীও বাচ্চার যত্ন নিতে ব্যস্ত থাকেন। এই সময় অনেক পুরুষ অবচেতনভাবে নিজেকে অবহেলিত মনে করতে শুরু করেন, যা তাঁদের মানসিক দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়।
৫. পার্টনারের ডিপ্রেশনের প্রভাব:
যদি মা নিজেই ‘পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন’-এ ভোগেন, তবে সেই নেতিবাচক প্রভাব বাবার ওপর পড়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়। দু’জনেই যখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
সতর্ক হওয়ার লক্ষণগুলো কী কী?
সবসময় ক্লান্তি বোধ করা।
বাচ্চার সাথে সময় কাটাতে অনীহা।
খিটখিটে মেজাজ বা হঠাত রাগ করা।
পরিবারের থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: নতুন বাবাদের এই অবসাদ কোনো দুর্বলতা নয়, এটি একটি ক্লিনিক্যাল অবস্থা। জীবনসঙ্গিনীর সাথে মনের কথা ভাগ করে নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে প্রফেশনাল কাউন্সেলিং করানো অত্যন্ত জরুরি। মনে রাখবেন, একজন সুস্থ বাবাই পারেন একটি সুস্থ শৈশব উপহার দিতে।





