দাবার দুনিয়ায় নতুন এক রূপকথার জন্ম দিলেন চেন্নাইয়ের ২০ বছরের গ্র্যান্ডমাস্টার আর প্রজ্ঞানন্দ। নরওয়ে দাবা টুর্নামেন্টের ষষ্ঠ রাউন্ড পর্যন্ত যার অবস্থান ছিল পয়েন্ট তালিকার একেবারে তলানিতে, টুর্নামেন্ট শেষে সেই প্রজ্ঞানন্দই ইতিহাস লিখে মুকুট পরলেন। এই মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়া প্রথম ভারতীয় দাবাড়ু হিসেবে তিনি নাম লেখালেন রেকর্ড বইয়ে। তার এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনকে বিশ্ব দাবার অন্যতম সেরা ‘কামব্যাক’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
টুর্নামেন্টের শুরুর ছবিটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। ষষ্ঠ রাউন্ড পর্যন্ত প্রজ্ঞার সংগ্রহ ছিল খুবই হতাশাজনক। টুর্নামেন্ট নেতা ওয়েসলি সো-র থেকে তিনি ৫.৫ পয়েন্টে পিছিয়ে ছিলেন। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ডি গুকেশ এবং ওয়েসলি সো-র কাছে টানা দুটি ক্লাসিক্যাল ম্যাচে পরাজয় প্রজ্ঞার শিরোপা জয়ের সম্ভাবনাকে প্রায় শূন্যে (০.৭ শতাংশ) নামিয়ে এনেছিল। এমন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানো কার্যত অসম্ভব বলেই ধরে নিয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু সব সমীকরণ উল্টে দিলেন এই তরুণ তুর্কি।
অষ্টম রাউন্ড থেকে জ্বলে ওঠেন প্রজ্ঞানন্দ। প্রথমে আলিরেজা ফিরুজাকে হারান এবং তারপর ম্যাগনাস কার্লসেনকে দ্বিতীয়বারের জন্য ক্লাসিক্যাল দাবায় পরাস্ত করেন। কার্লসেনের মতো কিংবদন্তিকে একই টুর্নামেন্টে দুবার হারানো দাবার জগতে অত্যন্ত বিরল। কার্লসেনের অনুপস্থিতিতেও জয় পাওয়া যায়, কিন্তু তাঁর উপস্থিতিতে এই কীর্তি গড়া যেন অসাধ্য সাধনের সমান। ২০০৭ সালে বিশ্বনাথন আনন্দ মোরেলিয়া-লিনারেস টুর্নামেন্টে কার্লসেনের উপস্থিতিতে জয়লাভ করেছিলেন। এরপর দীর্ঘ ১৭ বছর পর প্রজ্ঞানন্দই সেই বিরল সম্মানের অধিকারী হলেন।
কার্লসেনকে হারানোর পর প্রজ্ঞার গতি থামেনি। পরের রাউন্ডগুলোতে ডি গুকেশ এবং ভিনসেন্ট কাইমারকেও পর্যুদস্ত করেন তিনি। ক্লাসিক্যাল দাবায় টানা চারটি জয় তুলে নিয়ে নিশ্চিত করেন খেতাব। টুর্নামেন্টের নিয়মানুযায়ী প্রতিটি ক্লাসিক্যাল জয়ের জন্য তিন পয়েন্ট পাওয়া যায়, যা প্রজ্ঞাকে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। গেম থিয়োরি বিশেষজ্ঞ ড. মেহমেত মার্স সেভেন থেকে শুরু করে প্রজ্ঞার সহকারী বৈভব সূরি—সকলেই প্রজ্ঞার এই মানসিক দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
নিজের কেরিয়ারের সবচেয়ে বিশেষ জয় হিসেবে এই শিরোপাকে অভিহিত করেছেন প্রজ্ঞানন্দ। তিনি জানান, টুর্নামেন্টের শেষার্ধে তিনি কম্পিউটারের সাহায্য কম নিয়ে বরং নিজের স্বাভাবিক খেলার ওপর বেশি ভরসা রেখেছেন। ম্যাচের মাঝে পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং সময়ের চাপ এড়াতে দ্রুত চাল খেলার কৌশলই তাঁকে এই অসাধ্য সাধনে সাহায্য করেছে।
২০২৫ সালে টাটা স্টিল এবং গ্র্যান্ড চেস ট্যুর জয়ের পর নরওয়ে দাবার এই সাফল্য প্রজ্ঞার কেরিয়ারকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল। এটি শুধু একটি ট্রফি জয় নয়, বরং ভারতীয় দাবার নতুন এক শক্তির উত্থানের ঘোষণা। ম্যাগনাস কার্লসেনের নিজের শহরে, তাঁরই উপস্থিতিতে বিশ্বসেরা দাবাড়ুদের হারিয়ে এই জয় ভারতীয় দাবাকে আগামী দিনের জন্য এক নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে। বিশ্ব দাবার সিংহাসন জয়ের পথে প্রজ্ঞানন্দ যে কতটা প্রস্তুত, নরওয়ে দাবার আসর তা আরও একবার প্রমাণ করে দিল।





