অষ্টম শ্রেণির ছাত্রের ‘আত্মহত্যা’র খবরে যখন আকাশ ভেঙে পড়েছিল মা-বাবার মাথায়, তখন তার চেয়েও চাঞ্চল্যকর পদক্ষেপ নিলেন তাঁরা। স্কুল কর্তৃপক্ষের ‘আত্মহত্যা’র দাবি অস্বীকার করে, ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে এবং বিচার না পাওয়া পর্যন্ত মৃতদেহ বাড়িতে ফ্রিজারে রেখে দিয়েছেন মালদার এক দম্পতি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানিকচক থানার অধীনে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং একটি বেসরকারি স্কুল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
**ঘটনার সূত্রপাত: হস্টেলে ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যু**
মালদার বাসিন্দা ১৪ বছর বয়সী শ্রীকান্ত মণ্ডল একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করত। গত বুধবার হঠাৎই স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে তার পরিবারকে ফোন করে জানানো হয় যে, শ্রীকান্তের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়েছে এবং সে ‘আত্মহত্যা’ করেছে। এই খবর শুনে বাবা-মায়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।
তবে, পুত্র শোকের মধ্যেও ছেলের ‘আত্মহত্যা’র দাবি মানতে নারাজ বাবা-মা। শ্রীকান্তের বাবা প্রেম কুমার মণ্ডল মানিকচক থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
**বিচার না মেলা পর্যন্ত সৎকারে নারাজ পরিবার**
সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হলো, ছেলের মৃতদেহ সৎকার না করে তা বাড়িতেই একটি কাঠের বাক্সে বরফ দিয়ে তৈরি ‘ফ্রিজার’-এ সংরক্ষণ করে রেখেছেন পরিবার। প্রেম কুমার মণ্ডল দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “যতদিন না আমি বিচার পাব, আমার ছেলেকে কী ভাবে মারা হলো জানতে পারব, আমি ততদিন দেহ রেখে দেব।” প্রতিবেশীরাও এই ঘটনায় পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাদের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানাননি।
**স্কুলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন**
মৃত ছাত্রের পরিবারের অভিযোগ, স্কুল কর্তৃপক্ষ এই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রেম কুমার মণ্ডল বলেন, “আমার ছেলে হস্টেলে থাকত। সেখানে আরও ৮০ জন পড়ুয়া থাকে। অথচ কেউ ওকে ‘আত্মহত্যা’ করতে দেখেনি, এটা কী করে মেনে নেওয়া সম্ভব?” তিনি আরও বলেন, “আমার সন্দেহ ওকে মারধর করা হয়েছে। আমি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করেছি। আমার ছেলে এ কাজ করতে পারে না। আমি এর বিচার চাই।”
অন্যদিকে, স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাজির হোসেন সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।” প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এই ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। মৃত ছাত্রের পরিবারের এক সদস্যের দাবি, “ওকে মারধর করা হয়েছিল। সেই কারণেই মারা গিয়েছে বলে আমাদের ধারণা। বিষয়টিকে চেপে দেওয়া হচ্ছে।”
**পুলিশি তদন্ত ও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট:**
মানিকচক পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার মৃত ছাত্রের দেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। এরপরই দেহটি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এখনও পরিবারের হাতে এসে পৌঁছায়নি বলে তারা দাবি করেছেন।
**আইনগত দিক ও চাঞ্চল্য:**
একজন মৃতদেহ এভাবে দীর্ঘ দিন বাড়িতে রেখে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পুলিশ কেন এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না, সে প্রশ্নও উঠছে। যদিও মালদার পুলিশ সুপার প্রদীপ কুমার যাদবের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে এই ঘটনাকে ঘিরে গোটা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য এবং তীব্র জনরোষ সৃষ্টি হয়েছে। সবাই এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, এই রহস্যজনক মৃত্যুর কিনারা কবে হয় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
—
“`