২০২৫ – ২০১৬ সালের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ৩২ হাজার চাকরি বাতিলের ঘটনায় বৃহস্পতিবার (১২ জুন, ২০২৫) কলকাতা হাইকোর্ট প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের কাছে একাধিক বিস্ফোরক প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইল। বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী ও বিচারপতি ঋতব্রত কুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চের এই প্রশ্নগুলির জবাব আগামী ২৩ জুন মামলার পরবর্তী শুনানিতে রাজ্য সরকারকে দিতে হবে। একইসঙ্গে মামলার সঙ্গে জড়িত অন্যরাও সেদিন নিজেদের বক্তব্য পেশ করার সুযোগ পাবেন, যা এই মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ইন্টারভিউ বোর্ড থেকে এজেন্সি: হাইকোর্টের নিশানায় নিয়োগ প্রক্রিয়া
এদিনের শুনানিতে ডিভিশন বেঞ্চ নিয়োগে কোনো এজেন্সিকে নিযুক্ত করা হয়েছিল কি না, তা জানতে চান। একইসঙ্গে ইন্টারভিউ বোর্ড ছাড়া সিলেকশন কমিটির ভূমিকা কী ছিল, সে বিষয়েও তাঁরা প্রশ্ন তোলেন। বেঞ্চের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার জন্য রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত আদালতের কাছে সময় চেয়ে নেন।
আদালত প্যানেল প্রকাশ করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও জানতে চায়। যদিও রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল এই প্রশ্নের উত্তরে জানান, প্যানেল প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে আগামী ২৩ জুন মামলার পরবর্তী শুনানিতে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ আদালতে প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর দেবে।
এজি’র সওয়াল: ‘দুর্নীতি’ শব্দ ব্যবহার প্রমাণ ছাড়াই, বিচারপতির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এদিন শুনানিতে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের পক্ষে অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত বলেন, “নির্দেশে দুর্নীতি শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে কোনো প্রমাণ ছাড়াই। (অধুনা প্রাক্তন) বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় মামলাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সিঙ্গল বেঞ্চের বিচারপতি এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে নিয়োগের সমস্ত খুঁটিনাটিতে কার্যত হস্তক্ষেপ করেছেন। তাঁর ভূমিকা বিচারপতির নাকি মামলাকারীর সেটাই গুলিয়ে গিয়েছে।”
পাশাপাশি, যাঁরা ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন, তাঁদের আদালতে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় – এই প্রসঙ্গ তুলে এজি প্রশ্ন তোলেন, “এটা কি একজন বিচারপতির কাজ?”
বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী জানতে চান, “অ্যাপটিটিউড টেস্ট কি নেওয়া হয়েছিল?” এজি’র উত্তর ছিল, “হ্যাঁ নেওয়া হয়েছিল। ইন্টারভিউ এবং অ্যাপটিটিউড টেস্ট একই দিনে নেওয়া হয়েছিল।”
বিচারপতি জানতে চান, “কোনো এজেন্সিকে কি বেআইনিভাবে এই নিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল?” এজি উত্তর দেন, “এজেন্সি নিযুক্ত হয়েছিল, তবে শুধুমাত্র ওএমআর শিটের প্রাপ্ত নম্বর সংগ্রহ করে দেওয়ার জন্য। এর থেকে বেশি কোনো ভূমিকা ছিল না।”
পাল্টা বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী জানতে চান, “কিন্তু ২০১২ সালের নিয়োগে এস বসুরায় ও কোম্পানিকে ওএমআর শিট মূল্যায়নের বরাত দেওয়া হয়েছিল?” রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল জানান, এই বিষয়টি জেনে নিয়ে তারপর আদালতকে জানানো হবে।
ইন্টারভিউ বোর্ডের ব্যাপারে এজি বলেন, “স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়মে বলা হয়েছে ইন্টারভিউ বোর্ডের পাশাপাশি একটা সিলেকশন কমিটি তৈরি করা যাবে। ওই কমিটির সদস্যরাই ইন্টারভিউ এবং অ্যাপটিটিউড টেস্ট নিয়েছিলেন।”
এখানেই বিচারপতির প্রশ্ন, “ইন্টারভিউ বোর্ডকে কিন্তু পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি রুলে। সেটা কি মানা হয়েছিল?” এই ব্যাপারে এজি স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি এবং পরের শুনানিতে জানাবেন বলে জানান।
তাড়াহুড়োর অভিযোগ: মামলার গতি নিয়ে প্রশ্ন তুললেন এজি
উল্লেখ্য, আদালত এদিন ২০১৬ সালের নিয়োগে প্যানেল প্রকাশ করা হয়েছিল কি না, জানতে চায়। এজি জানান, হ্যাঁ প্যানেল প্রকাশ করা হয়েছিল। এই প্রশ্নে আবারও তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সিঙ্গল বেঞ্চের বিচারপতি মামলার শুনানিতে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করেছিলেন।” এরপর দুটি দিনের (২ ডিসেম্বর ২০২২ এবং ১১ মে ২০২৩) উল্লেখ করে এজি দাবি করেন, এই দু’দিনের শুনানিতে তাড়াহুড়ো করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, মামলায় ইন্টারভিউ বোর্ড নিজেদের বক্তব্যও জানাতে পারেনি বলে দাবি করেন এজি। এছাড়াও প্রত্যেক জেলা থেকে দু’জন করে প্রার্থীকে ডেকে বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় তাঁদের থেকে পরীক্ষার ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলেন। কীসের ভিত্তিতে তিনি এই কাজ করেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে রাজ্যের তরফে।
এই আইনি টানাপোড়েন এবং ডিভিশন বেঞ্চের তীক্ষ্ণ প্রশ্নগুলি এখন শিক্ষক নিয়োগ মামলার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। আগামী ২৩ জুন পর্ষদ কী জবাব দেয়, তার উপরেই নির্ভর করছে হাজার হাজার শিক্ষকের ভবিষ্যৎ এবং এই জটিল মামলার নিষ্পত্তি।