একটি সামান্য বাইক দুর্ঘটনা। সেখান থেকে সুস্থ হওয়ার বদলে সোজা মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়া! প্রাক্তন সেনাকর্মী সন্দীপ মঞ্জার্গির মৃত্যুর ঘটনা প্রথমে স্বাভাবিক মনে হলেও, তদন্তে উঠে এল এক জঘন্য ষড়যন্ত্রের কাহিনি। স্বামীর জীবনবিমার ২ কোটি টাকা হাতাতে স্ত্রী ও তাঁর প্রেমিক যেভাবে হাসপাতালের বেডকে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করেছেন, তা শুনে শিউরে উঠছে গোটা দেশ।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৩ মার্চ, যখন বাইক দুর্ঘটনায় অল্প আহত হন সন্দীপ। চিকিৎসার জন্য তাঁকে প্রথমে হুক্কেরি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সন্দীপের স্ত্রী সুমা মঞ্জার্গি তাঁকে ঘটপ্রভার জিজি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেন। ১৫ মার্চ সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্দীপের মৃত্যু হয়। হাসপাতালের নথিতে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয় ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’। প্রাথমিক ময়নাতদন্তেও বিষক্রিয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু তদন্তকারীদের মনে খটকা লাগে, কারণ দুর্ঘটনায় সন্দীপের কোনো গুরুতর আঘাত ছিল না।
তদন্তে নতুন মোড় আসে যখন সুমার প্রেমিক পুন্ডলিক ডোম্বার সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট করে সন্দীপের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পুলিশ সেই পোস্টটি দেখেই নড়েচড়ে বসে। সন্দেহ হয়, একজন বাইরের ব্যক্তি কীভাবে মৃত্যুর অন্তর্নিহিত তথ্য জানল? পুন্ডলিককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের পরই ভেঙে পড়ে সে। জানা যায়, সন্দীপ ও পুন্ডলিক ব্যবসায়িক অংশীদার ছিল, আর সেই সুবাদেই সন্দীপের স্ত্রী সুমার সঙ্গে পুন্ডলিকের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
তদন্তে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ ছক। সন্দীপের নামে তিনটি পৃথক জীবনবিমা সংস্থা থেকে প্রায় ২ কোটি টাকার পলিসি করা ছিল। এই টাকা হস্তগত করার লক্ষ্যেই সন্দীপকে সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনা করেন সুমা ও পুন্ডলিক। জিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা গোপনে স্যালাইনের সঙ্গে বিষ এবং ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেয়। মৃত্যুকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে প্রমাণ করার জন্য শুধু খুনের ছকই নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল।
তদন্তকারীদের দাবি, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট যাতে পুলিশের সন্দেহের বাইরে থাকে, তার জন্য হাসপাতাল কর্মী, ফরেনসিক বিভাগের সদস্য এবং কয়েকজন সরকারি আধিকারিককে প্রায় ৩ লক্ষ টাকা ঘুষ দেওয়া হয়েছিল। সরকারি নথিতে কারচুপি করে হত্যার প্রমাণ লোপাট করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি ও জেরার মুখে সব পর্দা ফাঁস হয়ে যায়। এই ঘটনায় স্ত্রী সুমা, প্রেমিক পুন্ডলিক-সহ মোট ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ বিষের পাত্র, সিরিঞ্জ এবং ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করেছে। একজন প্রাক্তন সেনাকর্মীর এই মর্মান্তিক পরিণতি শুধু একটি পরিবারকেই ধ্বংস করেনি, বরং চিকিৎসা ও ফরেন্সিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।





