তামিলনাড়ুর রাজনীতির রুপোলি পর্দা পেরিয়ে বাস্তবের সিংহাসনে এখন থালাপথি বিজয়। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ গ্রহণ করেছেন তিনি। কিন্তু তাঁর এই জয়ের আনন্দের মাঝেই দানা বাঁধছে এক বিশাল অর্থনৈতিক বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচনী ইশতেহারে বিজয় যে পাহাড়প্রমাণ জনমোহিনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা পূরণ করতে গিয়ে কি দেউলিয়া হয়ে যাবে রাজ্য? অর্থনীতিবিদদের হিসেব অনুযায়ী, বিজয়ের সব প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে বছরে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার প্রয়োজন, যা তামিলনাড়ুর মোট রাজস্বের প্রায় অর্ধেক।
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই অবশ্য বিজয় বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি ‘অ্যাকশন’-এ বিশ্বাসী। রবিবার চেয়ারে বসেই তিনি তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন। প্রথমত, গৃহস্থালি গ্রাহকদের জন্য প্রতি মাসে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিনামূল্যে বিদ্যুৎ প্রদান। দ্বিতীয়ত, নারী সুরক্ষার জন্য ‘সিঙ্গা পেন’ (সিংহী) নামে একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন। এবং তৃতীয়ত, রাজ্যজুড়ে মাদক পাচার রুখতে ৬৫টি বিশেষ মাদকবিরোধী ইউনিট তৈরির নির্দেশ।
তবে এই শুরুটা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। বিজয়ের ইশতেহারে এমন কিছু প্রতিশ্রুতি রয়েছে যা শোরগোল ফেলে দিয়েছে। বেকার স্নাতকদের জন্য মাসে ৪০০০ টাকা, মহিলাদের জন্য ২৫০০ টাকা মাসিক ভাতা, বছরে ৬টি বিনামূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার এবং নববধূর জন্য ৮ গ্রাম সোনা ও রেশমি শাড়ি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন তিনি। এমনকি প্রতিটি নবজাতকের জন্য সোনার আংটিও তাঁর প্রতিশ্রুতির তালিকায় রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিপুল ব্যয়ভার বহন করা তামিলনাড়ুর বর্তমান পরিস্থিতির নিরিখে প্রায় অসম্ভব। মাদ্রাজ স্কুল অফ ইকোনমিক্সের পরিচালক এন. আর. ভানুমূর্তি সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই প্রকল্পগুলি কার্যকর করার আগে ব্যয় যৌক্তিক করা প্রয়োজন। ২০২৪-২৫ সালে রাজ্যের মোট কর রাজস্ব ধরা হয়েছে ২.১ লক্ষ কোটি টাকা। সেখানে বিজয়ের প্রকল্পগুলোতেই চলে যাবে ১ লক্ষ কোটি টাকা। অর্থাৎ উপার্জনের ৫০ শতাংশই স্রেফ ভরতুকিতে খরচ হবে। রাজ্যের ঋণের বোঝা এবং রাজস্ব ঘাটতি (জিএসডিপি-র প্রায় ৩%) এমনিতেই উদ্বেগের কারণ। এই অবস্থায় প্রতি বছর অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি টাকার নগদ যোগান রাজ্যের অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে থালাপথি বিজয়কে নিয়ে উন্মাদনা তুঙ্গে। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ২৫ লক্ষ টাকার ঋণ এবং সাধারণ পরিবারের জন্য ২৫ লক্ষ টাকার স্বাস্থ্য বিমার প্রতিশ্রুতি তাঁকে ‘মসিহা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখন দেখার, রুপোলি পর্দার ‘থালাপথি’ বাস্তবের অর্থনৈতিক জটিলতা কাটিয়ে তামিলনাড়ুকে সত্যিই সোনার বাংলা বা সোনালী তামিলনাড়ু উপহার দিতে পারেন কি না।





