হাওড়ার শৌচাগারে মেছোবিড়াল, জনসচেতনতায় ফিরে গেল পরিবেশে

হাওড়ার উলুবেড়িয়ার মালিকপাড়ায় এক গৃহস্থের বাড়ির শৌচাগারে মেছোবিড়াল ঢুকে পড়ার ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়ালেও, স্থানীয়দের সচেতনতায় প্রাণীটিকে নিরাপদে তার প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। রাজ্যের এই নিরীহ প্রাণীটিকে এক ঝলক দেখতে এদিন মানুষের ঢল নেমেছিল, যদিও এদের নিয়ে ভুল ধারণাও বিদ্যমান।

জানা গেছে, মঙ্গলবার ভোররাতে উলুবেড়িয়ার উত্তম মালিকের বাড়ির বাথরুমে একটি পূর্ণবয়স্ক মেছোবিড়াল ঢুকে পড়ে। সকালে প্রাণীটিকে দেখতে পেয়ে গ্রামের লোকজন চিতাবাঘ ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং ‘বাঘ বাঘ’ বলে ভুল বার্তা ছড়াতে শুরু করে। হাওড়ায় মেছোবিড়ালের সংখ্যা প্রচুর হলেও, তাদের লাজুক ও নিরীহ প্রকৃতির কারণে অনেকেই এদের সচরাচর চোখে দেখেনি। তাই অনেকে এদের চিতাবাঘ বলে ভুল করে।

এই পরিস্থিতিতে প্রথম সচেতন পদক্ষেপ নেন কলেজে পড়ুয়া মানসী দোলুই। রাজ্য প্রাণী মেছোবিড়াল ঢুকেছে বুঝতে পেরেই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণকারী চিত্রক প্রামাণিক ও সুমন্ত দাসকে খবর দেন। খবর পেয়ে চিত্রক ও সুমন্ত দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং মানসীকে নিয়ে বাঘরোলটির অবস্থান দেখতে যান। ততক্ষণে প্রাণীটিকে দেখতে কয়েকশো মানুষ ভিড় জমিয়েছিল।

মেছোবিড়াল মূলত সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর, কীটপতঙ্গ, মাছ এবং হাঁস-মুরগির মতো ছোট প্রাণী খেয়ে থাকে। বন-জঙ্গলে খাবারের অভাব দেখা দিলে মাঝে মাঝে এরা লোকালয়ে চলে আসে। মানুষ দেখলে এরা সাধারণত লুকিয়ে পড়ে, তবে হাঁস-মুরগির খোঁজে এসে অনেক সময় হাঁস-মুরগির খাঁচা বা মানুষের বাড়িতে আটকা পড়ে যায়।

সাধারণত, অসচেতনতা বা অজ্ঞতার কারণে মানুষ এই নিরীহ প্রাণী দেখলেই তাদের উপর চড়াও হয়। কিন্তু এদিন মালিকপাড়ার স্থানীয় মানুষজন সচেতনতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এলাকার কিছু সচেতন যুবক যেমন বাপন, অভিজিৎ, কিশান, মঙ্গল, সুভাষ, কৌশিক দ্রুত সাহায্যে এগিয়ে আসেন। প্রাথমিকভাবে কিছু মানুষ আতঙ্কিত হয়ে প্রাণীটিকে চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়ার কথা বললেও, চিত্রক, সুমন্ত, মানসী এবং গ্রামের কিছু যুবক পুরো গ্রামকে মেছোবিড়াল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানান। তারা বোঝান যে, এই প্রাণী ভীতু এবং পরিবেশে মেছোবিড়ালের গুরুত্ব কতটা। তাদের কথায়, গ্রামের ছোট-বড় সকলেই প্রাণীটিকে গ্রামেই ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানায়।

এরপর রেঞ্জ অফিসার রাজেশ মুখার্জীর তত্ত্বাবধানে স্থানীয় ব্লক পশু চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে একজন পশু চিকিৎসক এসে মেছোবিড়ালটিকে পর্যবেক্ষণ করেন এবং এটিকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক বলে জানান। অবশেষে, চিত্রক প্রামাণিক ও সুমন্ত দাস মানসী এবং গ্রামের কিছু ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে গ্রামের মধ্যে থাকা খড়িবনের কাছে খাঁচা খুলে মেছোবিড়ালটিকে নিরাপদে তার প্রাকৃতিক পরিবেশে মুক্ত করে দেন।

চিত্রক প্রামাণিক এই প্রসঙ্গে বলেন, “রাজ্য প্রাণী মেছোবিড়ালকে উদ্ধারের পর পুনরায় তার পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো সুস্থ জীবজন্তুকে তার এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বন্যপ্রাণীকে তার নিজের এলাকাতেই থাকতে দেওয়া প্রকৃত পরিবেশ সংরক্ষণ।” এই ঘটনা হাওড়ার মানুষের পরিবেশ সচেতনতার এক ইতিবাচক ছবি তুলে ধরল।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy