হাইকোর্টের নির্দেশে বন্ধ হবে কি কলেজ ইউনিয়ন রুম? জায়গায় জায়গায় দেখা যাচ্ছে মিশ্র চিত্র

দক্ষিণ কলকাতার একটি আইন কলেজের ছাত্রীকে ধর্ষণের ভয়াবহ ঘটনার প্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে রাজ্যের সমস্ত কলেজের ইউনিয়ন রুম বা ছাত্র সংসদ কার্যালয় আপাতত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশিকার প্রভাব শুক্রবার থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র। কোথাও নির্দেশ মেনে কক্ষ বন্ধ রাখা হয়েছে, আবার কোথাও প্রশাসনিক নির্দেশিকার অভাবে এখনও পুরনো রীতিই বহাল রয়েছে।

কুলটি কলেজের চিত্র: প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের ভিন্ন দাবি

পশ্চিম বর্ধমানের কুলটি কলেজে শুক্রবার সকালে গিয়ে দেখা গেল, কলেজের টিচার ইনচার্জ রাজকুমার রায় নিজেই ছাত্র সংসদ কার্যালয়ের তালা পরীক্ষা করে ফিরছেন। তিনি দাবি করেন, “ইউনিয়ন রুম সাধারণত বন্ধই থাকে। কলেজে কোনও সামাজিক অনুষ্ঠান থাকলে ছাত্ররা অনুমতি নিয়ে সেই কার্যালয় খোলে। উচ্চশিক্ষা দপ্তর থেকে এখনও কোনও নির্দেশ পাইনি। তবে হাইকোর্টের নির্দেশ আসার পরে স্থায়ীভাবে তা বন্ধ রাখা হবে।”

তবে টিচার ইনচার্জের এই বক্তব্যের সঙ্গে সাধারণ পড়ুয়াদের অভিজ্ঞতা মেলেনি। দ্বিতীয় বর্ষের কলা বিভাগের ছাত্রী বনশিখা দাস বলেন, “এক সপ্তাহ আগেও ইউনিয়ন রুম খোলা ছিল। আজ থেকে সেটা বন্ধ দেখছি।” একই কথা বলেন দ্বিতীয় বর্ষের আরেক ছাত্রী নিকি যাদব, “ছাত্র সংসদ কার্যালয় রোজই খোলা হয়। আজকেই দেখতে পেলাম, সেই ঘর বন্ধ রয়েছে।”

এদিনও কুলটি কলেজে বেশ কিছু প্রাক্তনী তথা শাসকদলের ছাত্রনেতাকে কলেজ চত্বরে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে, এবং তাঁদের পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। তেমনই এক প্রাক্তনী তুলসী দাস, যিনি নিজেকে তৃণমূলের যুব সংগঠনের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করে বলেন, “কলেজে কাজ ছিল বলেই এখানে এসেছি।”

চিত্তরঞ্জন কলেজে কড়া পদক্ষেপ, কাজ করার অনুমতি বহাল

অন্যদিকে, চিত্তরঞ্জন কলেজে হাইকোর্টের নির্দেশ পালনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কলেজের অধ্যক্ষ ত্রিদিবসন্তপা কুণ্ডু জানান, “প্রত্যেকটি সংগঠনকে বলা হয়েছে, অনুমতি নিয়েই কলেজে প্রবেশ করতে হবে। তবে ছাত্র সংসদ কার্যালয় বন্ধই রয়েছে।” যদিও তিনি এও জানান যে, কার্যালয় বন্ধ থাকলেও সংগঠনের কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাক্তনীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

আসানসোলের কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার চন্দন কোনার জানিয়েছেন, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত উচ্চশিক্ষা দপ্তর থেকে হাইকোর্টের নির্দেশ সংক্রান্ত কোনো লিখিত বা মৌখিক নির্দেশ তিনি পাননি। তবে হাইকোর্টের নির্দেশ শোনার পর এদিন সকাল থেকেই তিনি কঠোর পদক্ষেপ করেছেন। রেজিস্ট্রার বলেন, “এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ কার্যালয় নেই, ফলে বন্ধ রাখারও কোনও প্রশ্ন ওঠে না। তবে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রাক্তনীদের অবাধ প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে। পড়ুয়ারা পরিচয়পত্র দেখালেই তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।”

হাইকোর্টের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কোনো কলেজের ছাত্র সংসদ কার্যালয় খুলতে হলে তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের অনুমতি নিতে হবে। এই প্রসঙ্গে চন্দন কোনার বলেন, “হাইকোর্টের নির্দেশে কী আছে, জানি না। উচ্চশিক্ষা দপ্তর কোনও বিশেষ নির্দেশিকা পাঠালে তা মেনে চলব।”

দুর্গাপুর কলেজগুলিতে ভিন্ন চিত্র: নির্দেশিকার অপেক্ষায় কর্তৃপক্ষ

উচ্চশিক্ষা দপ্তর থেকে কোনও নির্দেশিকা না আসায় শুক্রবার দুর্গাপুর গভর্নমেন্ট কলেজের ইউনিয়ন রুম খোলা ছিল। কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন এই কলেজে এদিন সকালে গিয়ে দেখা যায়, একদল ছাত্র কলেজের ইউনিয়ন রুমে বসে রয়েছেন। হাইকোর্টের নির্দেশের প্রসঙ্গ উঠলে কিছু ছাত্র বলেন, “কলেজের প্রিন্সিপাল এখনও পর্যন্ত ইউনিয়ন রুম বন্ধ করার ব্যাপারে কোনো নির্দেশ দেননি। তাই ইউনিয়ন রুম খোলা রাখা হয়েছে।”

কলেজের প্রিন্সিপাল দেবনাথ পালিত এ বিষয়ে বলেছেন, “উচ্চশিক্ষা দপ্তর থেকে এখনও কোনও নির্দেশিকা আসেনি। নির্দেশ হাতে পেলেই কলেজের ইউনিয়ন রুম বন্ধ করে দেওয়া হবে। ছাত্রদের সঙ্গে তা নিয়ে কথাও হয়েছে। ওরাও এই বিষয়ে সহমত পোষণ করেছে।” উল্লেখযোগ্য, দীর্ঘদিন ধরে দুর্গাপুর গভর্নমেন্ট কলেজে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়নি। এদিন দুর্গাপুরের মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলেজের ইউনিয়ন রুমও খোলা ছিল।

জেলা তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভাপতি অভিনব মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, শিক্ষা দপ্তর থেকে কলেজগুলিতে কোনও নির্দেশ এখনও এসে পৌঁছয়নি। নির্দেশ এলে এবং সরকারিভাবে তা জানানো হলে সেই মতো পদক্ষেপ করা হবে। হাইকোর্টের এই নির্দেশিকা রাজ্যের শিক্ষাঙ্গনে কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে, তা দেখতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy