নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহের ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ নিরসনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা এখন বড় ধরনের ধাক্কার সম্মুখীন। লিপুলেখ ও কালাপানি ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণের যে প্রচেষ্টা তিনি নিয়েছিলেন, তা এখন কার্যত ভেস্তে যাওয়ার পথে। বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে ব্রিটেন এবং চীন—উভয়কেই এই বিবাদে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাশে পেতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু কোনো দেশই নেপালের এই আহ্বানে সাড়া দেয়নি। ফলে, নিজের দেশের অভ্যন্তরেই এখন বড় প্রশ্নের মুখে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর এই কৌশল।
গত রবিবার (৩১ মে) নেপালের সংসদে প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি এই বিরোধ নিরসনের জন্য ব্রিটেন ও চীনের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির সমীকরণে দুই দেশের এই নীরবতা বা প্রত্যাখ্যান নেপালকে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত রব ফেনের বরাত দিয়ে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর প্রতিবেদনে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ব্রিটেন সুগৌলি চুক্তির অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও এই দ্বিপাক্ষিক বিবাদে কোনোভাবেই জড়াতে রাজি নয়। ব্রিটেনের স্পষ্ট বার্তা—ভারত ও নেপালের মধ্যকার এই সীমান্ত সমস্যা একান্তই তাদের নিজস্ব বিষয় এবং এটি তাদেরই আলোচনা করে সমাধান করতে হবে।
অন্যদিকে, নেপালের আরেক সম্ভাব্য ‘মধ্যস্থতাকারী’ চীনও একই পথ অনুসরণ করেছে। বেইজিং এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। অথচ, অতীতে নেপাল বিভিন্ন সময় চীনের বিরুদ্ধেও তাদের ভূখণ্ডে আগ্রাসনের অভিযোগ এনেছে। ২০২০ সালে হুমলা জেলায় চীনের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বা গোর্খা ও রাসুয়া সীমান্তে অনুপ্রবেশের অভিযোগ বেইজিংয়ের সঙ্গে কাঠমান্ডুর সম্পর্কের শীতলতাকেই প্রকাশ্যে এনেছিল। এখন ভারতের বিরুদ্ধে চীনের সাহায্য চাওয়ার এই নাটকীয় পটপরিবর্তন আন্তর্জাতিক মহলে নেপালের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
ইতিমধ্যেই নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহের এই একতরফা পদক্ষেপ নিয়ে বিভাজন শুরু হয়েছে। বালেনের দলের সভাপতি রবি লামিকশান বর্তমানে দিল্লি সফরে রয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে ভারত-নেপাল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর জোর দিয়ে জানিয়েছেন, কোনো বিবাদকেই দীর্ঘায়িত করা বা অহেতুক জটিল করা উচিত নয়। এটি প্রধানমন্ত্রীর কৌশলের বিপরীতে দলের অন্দরের ভিন্নমত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ভারত সরকারের অবস্থান অত্যন্ত সংযত ও স্পষ্ট। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাধানীর জয়সওয়াল অতীতেই স্পষ্ট করেছিলেন যে, সীমান্ত সংক্রান্ত যেকোনো অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে মুখোমুখি আলোচনা করাই একমাত্র পথ। অযথা তৃতীয় কোনো পক্ষকে ডেকে এনে বিবাদ বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। ভারতের এই নীতিগত অবস্থানেই এখন সিলমোহর পড়েছে ব্রিটেন ও চীনের নিস্পৃহতায়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বালেন শাহের এই ব্যর্থতা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত কূটনীতির পরাজয় নয়, বরং ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক মৈত্রী ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব না দেওয়ার খেসারত। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে বালেন শাহ শেষ পর্যন্ত দিল্লির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসার বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেন কি না।





