বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের মাস পেরোতে না পেরোতেই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে বিদ্রোহের আঁচ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। এবার সেই আগুনের আঁচ সরাসরি আছড়ে পড়ল খোদ দলেরই একসময়ের ‘পাওয়ার হাউস’ বীরভূমের অনুব্রত মণ্ডলের কথায়। গরু পাচার মামলায় জেল খেটে মুক্তির পর অনুব্রত মণ্ডল যে সুরে কথা বললেন, তা দলের অন্দরে বড়সড় ভাঙনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভোটের ভরাডুবি থেকে শুরু করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাকীত্ব—সব বিষয় নিয়েই এদিন তিনি খোলসা করে নিজের ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন।
অনুব্রতর নিশানায় প্রথমেই উঠে এসেছে ভোট কুশলী সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC)। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, দলের এই শোচনীয় পরাজয়ের নেপথ্যে রয়েছে আইপ্যাকের অদূরদর্শী নীতি ও অর্থলোভ। তাঁর কথায়, “১৯৯৮ সালে যখন তৃণমূলের জন্ম হয়েছিল, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী ছিলেন। আমাদের মতো সাধারণ কর্মীরাই দলকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিল। তখন কোনো আইপ্যাকের প্রয়োজন হয়নি। পরবর্তীতে কেন তাদের আনা হলো? ওদের কারণেই দল ডুবেছে। ওরা রাজনীতির কিছুই জানে না, কেবল পয়সা কামাতেই এসেছিল।” অনুব্রতর মতে, তৃণমূলের আজকের এই অবস্থার জন্য আইপ্যাকের পাশাপাশি দলের ভেতরের একাংশও দায়ী।
নিজের নিষ্ক্রিয়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এবারের ভোটে আমাকে কোনো দায়িত্বই দেওয়া হয়নি। কোর কমিটির বৈঠকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম আমার ভূমিকা কী? আমাকে বলা হলো, বিধায়করা ডাকলে যাওয়ার দরকার নেই। দল যদি আমাকে দূরে সরিয়েই রাখে, তবে আমি কেন আগ বাড়িয়ে কাজে নামব? বিজেপি মাঠে নেমে পরিশ্রম করেছে, তাই তারা জিতেছে।” পাশাপাশি তিনি বিদ্রোহী নেতাদের প্রতি নিজের সমর্থনের কথা খোলাখুলি জানিয়েছেন। দলের অন্দরে ভিন্ন মত বা পৃথক গোষ্ঠী তৈরি হওয়াকে তিনি কোনো ভুল হিসেবে দেখছেন না।
দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অনুব্রতর গলায় বিষাদের সুর স্পষ্ট। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “মমতা দিদি আজ বড় একা হয়ে গেছেন। দেখে খুব খারাপ লাগছে। আমরা সবাই তাঁকে প্রচণ্ড ভালোবাসতাম। কিন্তু শেষদিকে তিনি কার পাল্লায় পড়লেন, জানি না। সম্ভবত আইপ্যাকের মতো ভুল পরামর্শদাতাদের খপ্পরে পড়েই তাঁর এই দশা।”
রাজনীতিতে দল বদলের জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে অনুব্রত জানান, সম্মান না পেলে তিনি তৃণমূলের সঙ্গে আর থাকবেন না। তবে বিজেপিতে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। তাঁর এই মন্তব্যের পর রাজ্য রাজনীতির অন্দরমহলে শুরু হয়েছে জল্পনা। তাহলে কি তৃণমূলের ভিত আলগা হচ্ছে? না কি অনুব্রতর এই অভিমানে লুকিয়ে আছে নতুন কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ? উত্তর দেবে সময়। তবে এ কথা বলাই যায়, অনুব্রতর এই চাঁছাছোলা মন্তব্য তৃণমূলের অন্দরে বড়সড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াল।





