সন্দেশখালি জাল নোট কাণ্ডের মূল চক্রী অভিষেক তিওয়ারি নাগপুরে গ্রেফতার, বিপুল জালিয়াতির পর্দাফাঁস

সন্দেশখালিতে ১০ কোটি টাকার জাল নোট উদ্ধারের ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী, কুখ্যাত প্রতারক অভিষেক তিওয়ারিকে অবশেষে মহারাষ্ট্রের নাগপুর থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই গ্রেফতারির মধ্য দিয়ে রাজ্য ও দেশজুড়ে বিস্তৃত এক বিশাল আর্থিক জালিয়াতি চক্রের পর্দাফাঁস হয়েছে। গতকাল রবিবার ধৃত অভিষেককে ট্রানজিট রিমান্ডে সন্দেশখালি থানায় নিয়ে আসা হয়েছে এবং আজ তাকে বসিরহাট মহকুমা আদালতে পেশ করা হবে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ধৃত অভিষেকের বাড়ি কলকাতার গল্ফগ্রিনে এবং দিল্লিতেও তার বাড়ি রয়েছে। এই ব্যক্তিই ছিল জাল নোট কারবারের মূল মাথা, যার মদতেই দেশ তথা রাজ্যজুড়ে জাল নোটের এক বিশাল নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। এর আগেও অভিষেক পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিল। তখন তার বিরুদ্ধে ভুয়ো কোম্পানি খুলে ব্যবসায়ীদের ফাঁদে ফেলে প্রতারণা করার অভিযোগ ছিল। আসানসোলের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ২২ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কিছুদিন জেল খাটার পর জামিনে ছাড়া পেয়েই সে আবারও প্রতারণার কারবার শুরু করে। জাল নোট কাণ্ড প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই পুলিশ তাকে খুঁজছিল এবং অবশেষে ঘটনার সাতদিনের মাথায় মহারাষ্ট্রের নাগপুর থেকে তাকে পাকড়াও করা সম্ভব হয়।

কীভাবে চলত এই জালিয়াতি চক্র?

পুলিশ সূত্রে খবর, এই চক্রটি মূলত ব্যবসায়ীদের টার্গেট করত। জাল নোটের স্তূপের ওপর কিছু আসল নোট রেখে বড় বড় ব্যবসায়ীদের আকর্ষণ করা হতো। তাদের সহজ কিস্তিতে বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার প্রলোভনও দেখানো হতো, যাতে ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে আগ্রহী হন। অভিযোগ, এভাবেই ব্যবসায়ীদের ফাঁদে ফেলে ‘প্রসেসিং ফি’ বাবদ লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিত এই জাল নোটের কারবারিরা। কারও কাছ থেকে ২০ লক্ষ টাকা, আবার কারও কাছ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ‘প্রসেসিং ফি’ বাবদ আদায় করা হতো।

গোটা প্রতারণা প্রক্রিয়াটি চলত ভিডিও কলের মাধ্যমে। ‘প্রসেসিং ফি’ বাবদ টাকা আদায়ের দায়িত্বে ছিলেন অভিষেক ঘনিষ্ঠ এবং জাল নোট কাণ্ডে আগেই ধৃত মহিলা তিস্তা সেন। অভিযোগ, তিনিই ভিডিও কলের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের জাল নোট দেখিয়ে ফাঁদে ফেলতেন। তিনি আগেই পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন এবং জামিনে ছিলেন। সন্দেশখালিতে জাল নোট কাণ্ডের সূত্র ধরেই তাকে রামপুরহাটের একটি গেস্ট হাউস থেকে আবারও গ্রেফতার করা হয়েছে। ধামাখালির গেস্ট হাউস থেকে ১০ কোটি টাকার জাল নোট-সহ দেবব্রত চক্রবর্তী ও সিরাজউদ্দিন মোল্লা ধরা পড়ার পরই তিস্তা সেন ঝাড়খণ্ডে পালানোর ছক কষেছিলেন, যদিও পুলিশের তৎপরতায় তার সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

পুলিশের বক্তব্য ও পরবর্তী পদক্ষেপ:

এই বিষয়ে বসিরহাট জেলার পুলিশ সুপার হোসেন মেহেদি রহমান বলেন, “প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, জাল নোট কাণ্ডের নেপথ্যে মূল মাথা হিসেবে রয়েছেন অভিষেকই। তাকে আরও জেরা করার প্রয়োজন রয়েছে। কীভাবে এই জাল নোটের কারবার চলত, আর কারা রয়েছে এর পিছনে— সবটাই আমরা খতিয়ে দেখছি।” তিনি আরও জানান, “ধৃত চারজনকে (অভিষেক ও তার তিন সঙ্গী) মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করা হলে আরও অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছি। তদন্ত দ্রুত গতিতে চলছে।”

প্রসঙ্গত, গত ১৯শে জুলাই সন্দেশখালির ধামাখালি ফেরিঘাটের কাছে জেলবন্দি শেখ শাহজাহানের গেস্ট হাউসে অভিযান চালিয়ে পুলিশ প্রায় ১০ কোটি টাকার জাল নোট উদ্ধার করে। সেই ঘটনায় দেবব্রত চক্রবর্তী এবং সিরাজউদ্দিন মোল্লা নামে দক্ষিণ ২৪ পরগনার দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধার হওয়া নোটের অধিকাংশই ছিল ৫০০ টাকার, যার মধ্যে কিছু আসল নোটও মেশানো ছিল। সেই ঘটনার দু’দিনের মাথায় পুলিশ অন্যতম অভিযুক্ত তিস্তা সেনকে রামপুরহাট থেকে পাকড়াও করে। এবার নাগপুর থেকে গ্রেফতার করা হলো এই জাল নোট কাণ্ডের মূল পাণ্ডা অভিষেক তিওয়ারিকে। পুলিশের আশা, অভিষেকের জেরা থেকে এই বিশাল জালিয়াতি চক্রের গভীরতা এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্যদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসবে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy