২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক রেনেসাঁ দেখল দেশ। একদিকে যখন বিজেপি ২০৭টি আসন নিয়ে নবান্ন দখলের পথে, তখন শাসকদল তৃণমূলের ঝুলি থেকে একে একে খসে পড়েছে ৯টি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। উত্তরবঙ্গ থেকে জঙ্গলমহল— স্রেফ শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে ঘাসফুল শিবিরকে। কেন মানুষ এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিল? শাসকদলের এই ভরাডুবির নেপথ্যে কাজ করেছে কোন অদৃশ্য সমীকরণ? ইটিভি ভারতের বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এল চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য।
১. চা-বলয়ে আরএসএস-এর ‘সাইলেন্ট’ স্ট্র্যাটেজি
উত্তরের জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কালিম্পং ও আলিপুরদুয়ার—এই চার জেলার ২২টি আসনের একটিতেও জিততে পারেনি তৃণমূল। এর মূল কারিগর হিসেবে উঠে আসছে আরএসএস-এর নাম। গত কয়েক বছর ধরে চা-বাগানে ‘একর বিদ্যালয়’ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শ্রমিকদের ঘরের লোক হয়ে উঠেছেন সংঘ ঘনিষ্ঠরা। পাশাপাশি, বামেদের ভোট সরাসরি রামের বাক্সে যাওয়া এবং স্থানীয় দলগুলোর সঙ্গে বিজেপির কৌশলী জোট তৃণমূলকে পুরোপুরি মুছে দিয়েছে। মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী আনন্দময় বর্মনের ১ লক্ষের বেশি ব্যবধানে জয় এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
২. জঙ্গলমহলে ‘মমতা বনাম জনতা’র লড়াই
বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও ঝাড়গ্রাম—জঙ্গলমহলের ২৫টি আসনের প্রতিটিই গিয়েছে বিজেপির দখলে। এখানে লড়াইটা ছিল সরাসরি ‘মমতা বনাম জনতা’। স্থানীয়রা তৃণমূলের বিকল্প হিসেবে কংগ্রেস বা বামকে নয়, বেছে নিয়েছে বিজেপিকেই। অনেকে বাধ্য হয়ে ‘চাঁদ বণিকের শিবপুজোর’ মতো বাম হাতে পদ্মের বোতাম টিপেছেন স্রেফ তৃণমূলের ওপর ক্ষোভ থেকে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, জঙ্গলমহলের অনেক সংখ্যালঘু বুথেও এবার ফুটেছে পদ্ম। ভোটারদের প্রতিষ্ঠান বিরোধী মনোভাব এখানে বিজেপির পথ প্রশস্ত করেছে।
৩. শিল্পতালুকে ‘এসআইআর’ ফ্যাক্টর ও নিচুতলার বিচ্ছিন্নতা
পশ্চিম বর্ধমানের ৯টি আসনেই তৃণমূল শূন্য। আসানসোল উত্তরে বিদায়ী মন্ত্রী মলয় ঘটকের হারের বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ভোটার তালিকা (SIR) থেকে ২৬ হাজার ভোটারের নাম বাদ যাওয়া, যাদের সিংহভাগই ছিল তাঁর ভোটব্যাংক। অন্যদিকে, গ্রামীণ এলাকার সঙ্গে নিচুতলার নেতাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং অনুগামীদের দাদাগিরি শিল্পাঞ্চলেও ঘাসফুল পুড়িয়ে খাক করে দিয়েছে।
৪. পূর্ব মেদিনীপুরে ‘অধিকারী’ ক্যারিশ্মা
পূর্ব মেদিনীপুরের ১৬টি আসনের সবকটিতেই পদ্ম ফুটেছে। এখানে লড়াইটা ছিল মূলত অধিকারী পরিবারের সঙ্গে তৃণমূলের। শান্তিকুঞ্জের সঙ্গে জেলাবাসীর নিবিড় যোগাযোগ এবং যেকোনো বিপদে সরাসরি শুভেন্দু অধিকারীদের পাশে পাওয়ার আশ্বাসই জেলাকে তৃণমূল-মুক্ত করেছে। চমকে দেওয়ার মতো তথ্য হলো, মুখে হিন্দুত্বের কথা থাকলেও এই জেলায় সংখ্যালঘুদের একটি বড় অংশ শুভেন্দু অধিকারীর ওপর ভরসা রেখেছে। সাথে যোগ হয়েছে তৃণমূলের নিজেদের মধ্যে তীব্র গোষ্ঠীকোন্দল ও একে অপরের ভোট কাটার রাজনীতি।
৫. ঔদ্ধত্য ও দুর্নীতির সম্মিলিত ফল
৯টি জেলাতেই তৃণমূলের পতনের সাধারণ সূত্রটি হলো—নেতাদের সীমাহীন দুর্নীতি ও নিচুতলার কর্মীদের দুর্বিনীত আচরণ। ভোটারদের মতে, শাসকদলের দাপট ও দাদাগিরির বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ইভিএমে আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়েছে। বিজেপি কোথাও এই ক্ষোভকে উসকে দিয়েছে, আবার কোথাও সাধারণ মানুষের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তৃণমূলের শেষ চিহ্নটুকু মুছে দিয়েছে।
বাংলার রাজনীতিতে এই ‘শূন্যতা’ তৃণমূলের জন্য স্রেফ পরাজয় নয়, বরং অস্তিত্বের সংকট হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।





