বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যে দ্রুততার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে থাকল পূর্ব মেদিনীপুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত এই জেলায় তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক ভিত কার্যত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। রাজ্যের প্রথম জেলা পরিষদ হিসেবে তৃণমূলের হাত থেকে দখলমুক্ত হলো পূর্ব মেদিনীপুর। শুক্রবার বিকেলে মেদিনীপুরের ডিভিশনাল কমিশনারের দপ্তরে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দিলেন জেলা পরিষদের সভাধিপতি উত্তম বারিক।
২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৭০টি আসনের মধ্যে ৫৬টিতে জয়লাভ করে একক শক্তিতে বোর্ড গঠন করেছিল তৃণমূল। প্রবীণ নেতা উত্তম বারিককে সভাধিপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে দলের অন্যতম মুখও ছিলেন। কিন্তু রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। শুভেন্দু অধিকারীর মুখ্যমন্ত্রিত্বে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই উত্তম বারিক কার্যত জেলা পরিষদ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। অবশেষে শুক্রবার দীর্ঘ জল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিনি ইস্তফা দিলেন।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে উত্তম বারিক বলেন, “আজ ডিভিশনাল কমিশনারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি। আগামী ৬-৭ দিনের মধ্যে আইনি শুনানি সম্পন্ন হবে, তারপরই এই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হবে।” এখন প্রশ্ন উঠেছে, এই বিশাল জেলা পরিষদের ভবিষ্যৎ কী? নবান্ন সূত্রে খবর, রাজ্য সরকার এখন এখানে একজন সরকারি আধিকারিককে ‘প্রশাসক’ হিসেবে নিয়োগ করে দৈনন্দিন কাজ চালানোর পরিকল্পনা করছে। অথবা, বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের মধ্য থেকে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
এই ঘটনাকে ‘শুভেন্দু অধিকারীর উন্নয়নযজ্ঞের জয়’ বলে অভিহিত করেছেন বিজেপির জেলা বিরোধী দলনেতা বামদেব গুচ্ছাইত। তিনি বলেন, “উত্তমবাবু এলাকার উন্নয়নের খাতিরেই এই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পূর্ব মেদিনীপুরের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বেই সম্ভব।” তাঁর এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনা উসকে দিয়েছে—উত্তম বারিক কি তবে বিজেপির পথেই হাঁটছেন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর থেকেই রাজ্যের রাজনীতিতে তৃণমূলের পায়ের তলার মাটি সরছে। দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জনই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ‘আসল তৃণমূল’ গড়ে তুলেছেন। জেলা স্তরে তৃণমূল কর্মীদের রাতারাতি বিজেপিতে যোগ দেওয়ার এই জোয়ার পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদের এই পতনকে আরও নিশ্চিত করল। একদিকে নন্দীগ্রামে তৃণমূলের ভরাডুবি, অন্যদিকে শুভেন্দুর জেলা হিসেবে পরিচিত পূর্ব মেদিনীপুরে দলীয় শাসন ধূলিসাৎ হওয়া—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য এই বিপর্যয় এক মস্ত বড় ধাক্কা। এখন দেখার, এই ভাঙন ঠেকাতে নবান্ন আর কোনো কৌশলী পদক্ষেপ নেয় কি না।





