পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় এবং যুগান্তকারী অধ্যায় রচিত হলো। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক সূর্যোদয় দেখল বাংলা। তবে এই নির্বাচনে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জয়ের চেয়েও বড় আলোচনা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রাজ্যের সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া ‘ভোট সংস্কৃতি’। দশকের পর দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গ যে নির্বাচনী হিংসা, বুথ দখল আর রক্তপাতের কলঙ্ক বহন করে আসছিল, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন তা মুছে দিল এক লহমায়। তাই রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে বলছেন—ভোটে হার-জিত যারই হোক না কেন, এবারের প্রকৃত ‘ম্যান অফ দ্য ম্যাচ’ হলো ভারতের নির্বাচন কমিশন।
বাংলার নির্বাচনী ইতিহাসে ১৯৭২ সালের পর এই প্রথম কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দলের অর্থাৎ ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। কিন্তু এই ক্ষমতার পটপরিবর্তনের থেকেও মানুষের মনে বেশি দাগ কেটেছে ভোটের পরিবেশ। রিগিং নেই, ছাপ্পা নেই, নেই কোনো বুথ জ্যাম কিংবা প্রাণহানি। এমন শান্তিতে এবং উৎসবের মেজাজে মানুষ শেষ কবে ভোট দিয়েছে, তা স্মৃতির অতলে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে মূল কারিগর হিসেবে উঠে এসেছে নির্বাচন কমিশন এবং তাঁদের ‘সুপারহিরো’ কেন্দ্রীয় বাহিনী।
ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের শুরুতেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কড়া বার্তা দিয়েছিলেন যে, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করাতে কমিশন বদ্ধপরিকর। সেই কথার প্রতিফলন মিলল প্রতিটি ধাপে। একদিকে যেমন স্বচ্ছ ভোটার তালিকা নিশ্চিত করা হয়েছিল, তেমনই পুলিশ ও প্রশাসনকে রাখা হয়েছিল পক্ষপাতমুক্ত। বিপুল পরিমাণ কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতিতে ভোটাররা দীর্ঘদিনের জমে থাকা ভয় কাটিয়ে বুথমুখী হয়েছেন।
অধ্যাপক প্রতীপ চট্টোপাধ্যায় এই পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “নির্বাচন কমিশন এবার প্রমাণ করে দিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গেও হিংসামুক্ত ভোট সম্ভব। নির্বাচন ঘোষণার দিন থেকে শুরু করে সিআইআর (SIR) প্রক্রিয়া এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে কমিশন এবার ম্যান অফ দ্য সিরিজ। যেহেতু ভোট শান্তিতে হয়েছে, তাই বিজয়ী বা বিজিত কোনো পক্ষই এবার কারচুপির অভিযোগ তুলতে পারবে না।” ২০২৬-এর এই নির্বাচন কেবল একটি সরকার পরিবর্তন নয়, বরং বাংলার গণতন্ত্রের এক স্বচ্ছ ও সুশাসিত ভোরের প্রতীক হয়ে রইল।





