মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের আবহে এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা। বুধবার কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ ‘হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস’-এ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা খর্ব করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পাস হয়েছে। এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো, কংগ্রেসের আগাম অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট যেন একক সিদ্ধান্তে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে না পারেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের তেহরানে ইজরায়েলি সেনার হামলার পর থেকেই পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। এই সংঘাতের ফলে বিশ্বের কৌশলগত জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এই পথ দিয়েই বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশ সরবরাহ করা হয়। প্রণালী বন্ধ হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের দাম হু হু করে বেড়ে চলেছে, যা বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ দেখালেও, এখনও পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান সাফল্য আসেনি।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে নিয়ন্ত্রণ করতে ডেমোক্র্যাটরা এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। হাউজ ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির বিশিষ্ট ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি মিক্সের নেতৃত্বে এই প্রস্তাবটি আনা হয়। বিতর্কের সময় মিক্স তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যথেষ্ট হয়েছে। প্রেসিডেন্টকে এবার সঠিক পথে চলতে হবে। তাঁর পছন্দের যুদ্ধের বোঝা বইতে বইতে সাধারণ মানুষ ক্লান্ত। গ্যাস স্টেশন থেকে সুপার মার্কেট, সব জায়গায় মুদ্রাস্ফীতির দাপট স্পষ্ট।”
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এই প্রস্তাব পাসের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করেছেন রিপাবলিকান দলের চার সদস্য—থমাস মাসি, ব্রায়ান ফিটসপ্যাট্রিক, টমাস ব্যারেট এবং ওয়ারেন ডেভিডসন। দলীয় হুইপ উপেক্ষা করে তাঁদের এই বিদ্রোহ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত ২১৫-২০৮ ভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়। উল্লেখ্য, দুই সপ্তাহ আগেও একই ধরনের প্রস্তাব পাসের চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু স্পিকার মাইক জনসন শেষ মুহূর্তে অধিবেশন স্থগিত করে তা আটকে দিয়েছিলেন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তাঁর শাসনামলে আমেরিকা কোনো নতুন যুদ্ধে জড়াবে না এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানেই তিনি মনোযোগ দেবেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে সম্পূর্ণ বিপরীত। ইরানের সঙ্গে বারবার সংঘাতে জড়িয়ে পড়া ট্রাম্পের সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন এই প্রস্তাবটি উচ্চকক্ষ সেনেটে পাঠানো হবে। সেখানে পাস হলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের সামরিক ক্ষমতা অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী।





