এক ধরনের নেতৃত্ব থাকে যা কেবল নির্দেশ দেয় না, বরং মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে। সেই নেতৃত্বে থাকে সাধারণ মানুষের ওপর অগাধ আস্থা এবং সামনে থেকে লড়াই করার অদম্য সাহস। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক আহ্বানগুলোতে ঠিক সেই বৈশিষ্ট্যেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তিনি দেশবাসীকে যেখানে সম্ভব ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ করা, গণপরিবহণ ব্যবহার বাড়ানো, পেট্রোল-ডিজেলের ব্যবহার কমানো, রান্নার তেল ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া এবং স্বদেশি পণ্য কেনার এক বিশেষ আবেদন জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর এড়িয়ে চলা এবং সোনা কেনার আগে দু’বার ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ও ভারতের কৌশল
বর্তমানে বিশ্ব পরিস্থিতি চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহ এবং ইরান-আমেরিকা উত্তেজনার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। এই কঠিন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানগুলো আদতে কোনও দুর্বলতার চিহ্ন নয়। বরং এটি এমন এক নেতার পরিচয়, যিনি দেশের নাগরিকদের কেবল ‘শাসিত’ হিসেবে নয়, বরং দেশের ‘অংশীদার’ হিসেবে দেখেন। প্রতিটি বাঁচানো লিটার জ্বালানি বা সাশ্রয় করা বিদেশি মুদ্রা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকটের বিরুদ্ধে ভারতের সুরক্ষা কবচ তৈরি করছে।
নিজের কনভয়ে কাটছাঁট: উদাহরণ যখন প্রধানমন্ত্রী নিজে
অন্যকে উপদেশ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী নিজেই সেই বার্তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। সম্প্রতি তাঁর গুজরাট ও অসম সফরে নিরাপত্তার ভারসাম্য বজায় রেখেই কনভয়ের গাড়ির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। এছাড়া, সরকারি খরচ বাঁচাতে নতুন গাড়ি না কিনে তাঁর কনভয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপে অনুপ্রাণিত হয়ে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, রেখা গুপ্ত এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও নিজেদের কনভয় ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গান্ধিবাদী জনসম্পৃক্ততা ও ঐতিহাসিক ত্যাগ
মহাত্মা গান্ধি যেভাবে সাধারণ মানুষকে জাতীয় আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছিলেন, মোদিও সেই পথেই ‘স্বচ্ছ ভারত’ থেকে শুরু করে ‘আত্মনির্ভর ভারত’ অভিযানে জনসম্পৃক্ততাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বিরোধীরা এই সংযমের আহ্বানকে সমালোচনা করলেও সাধারণ মানুষ এটিকে অত্যন্ত দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। ১৯৬২ বা ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় দেশবাসীকে যে ধরনের কঠিন ত্যাগের মুখোমুখি হতে হয়েছিল—যেমন গয়না দান করা বা একবেলা না খেয়ে থাকা—তার তুলনায় মোদির বর্তমান আহ্বান অনেক বেশি বাস্তবমুখী। মেট্রো ব্যবহার করা বা তেল কম খাওয়ার অভ্যাস মূলত ভবিষ্যতের স্বার্থে এক সুশৃঙ্খল জীবনধারা গড়ার প্রয়াস।
স্বদেশি ও আত্মনির্ভরতার নতুন দিগন্ত
প্রধানমন্ত্রীর ‘স্বদেশি’ আহ্বান কেবল আবেগ নয়, এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কৌশল। ভারতীয় পণ্য কেনা মানে দেশের অর্থ দেশের মধ্যেই রাখা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা। প্রাকৃতিক চাষ বা ভোজ্য তেলের আমদানি কমানোর বার্তা ভারতকে স্বাবলম্বী করার এক বৃহত্তর লক্ষ্য। এই সমস্ত আহ্বানের মূলে রয়েছে একটিই ধারণা—ভারত গঠন প্রক্রিয়ায় দেশের প্রতিটি নাগরিক সক্রিয় অংশীদার। প্রধানমন্ত্রী আইন করে নয়, বরং বিশ্বাসের ভিত্তিতে দেশবাসীর কাছে এই সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন, যা এক শক্তিশালী ভারতের ভিত গড়ে তুলছে।





