ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার এক চরম সংকটের ছবি উঠে এল সাম্প্রতিক ‘স্কুল এডুকেশন সিস্টেম ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক রিপোর্টে। ডিজিটাল ইন্ডিয়া বা আধুনিক ভারতের স্লোগান শোনা গেলেও, দেশের হাজার হাজার সরকারি স্কুলের বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়। নূন্যতম পরিষেবাটুকু না থাকায় শিক্ষা ব্যবস্থা এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে।
রিপোর্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১.১৯ লক্ষ স্কুলে আজও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। যেখানে আধুনিক যুগে কম্পিউটার শিক্ষার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে পানীয় জলের অভাব এবং শৌচাগার না থাকার মতো আদিম সমস্যা এখনও বিদ্যমান। প্রায় ৯৮ হাজার স্কুলে ছাত্রীদের জন্য আলাদা শৌচাগার নেই এবং ৬১ হাজারেরও বেশি স্কুলে শৌচাগার থাকলেও তা ব্যবহারের সম্পূর্ণ অযোগ্য। এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণেই মূলত ছাত্রীরা স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। এছাড়া প্রায় ৬০ হাজার স্কুলে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা নেই এবং ১৪ হাজার স্কুলে পানীয় জলের কোনো সংযোগই নেই। অর্ধেকের বেশি সরকারি স্কুলে কোনো বিজ্ঞান গবেষণাগার বা ল্যাবরেটরি পর্যন্ত অমিল।
শিক্ষক নিয়োগের অভাব এবং পরিকাঠামোগত সমস্যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে ১ লক্ষ ৪ হাজারেরও বেশি স্কুল চলছে মাত্র এক জন শিক্ষক দিয়ে। বিহার ও ঝাড়খণ্ডের মতো বড় রাজ্যগুলিতে কয়েক লক্ষ শিক্ষকের পদ শূন্য পড়ে আছে। তবে শুধু সংখ্যার অভাব নয়, শিক্ষকদের গুণমান নিয়েও কড়া প্রশ্ন তুলেছে নীতি আয়োগ। দেখা গিয়েছে, মাত্র ১০-১৫ শতাংশ সরকারি শিক্ষক নিজের বিষয়ে ৬০ শতাংশের বেশি নম্বর পাওয়ার যোগ্য। বিশেষ করে গণিতে শিক্ষকদের গড় নম্বর মাত্র ৪৬ শতাংশ, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
আরেকটি ভয়াবহ তথ্য হলো, দেশে প্রায় ৮ হাজার স্কুলে বর্তমানে একজনও পড়ুয়া নেই। এই তালিকায় সবচেয়ে উপরে নাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের (৩,৮১২টি স্কুল)। মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের জাতীয় গড় ১১.৫ শতাংশ হলেও বাংলায় তা দাঁড়িয়েছে ২০ শতাংশে। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও কর্নাটক, অসম ও অরুণাচল প্রদেশেও স্কুলছুটের হার যথেষ্ট আশঙ্কাজনক। এমনকি উত্তরপ্রদেশ ও বিহারেও স্কুলছুটের সংখ্যা পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক স্তরের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ভারত তার মোট জাতীয় উৎপাদনের (GDP) মাত্র ৪.৬ শতাংশ শিক্ষার জন্য বরাদ্দ করে। যেখানে ব্রিটেন, আমেরিকা বা ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশগুলি ভারতের তুলনায় বহুগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করে। ‘পরখ’-এর রেটিং অনুযায়ী, শিক্ষার মানে সবথেকে খারাপ ফল করেছে ঝাড়খণ্ড, গুজরাট এবং জম্মু-কাশ্মীর। অন্যদিকে পাঞ্জাব, রাজস্থান ও ওড়িশার মতো রাজ্যগুলি কিছুটা উন্নত অবস্থানে রয়েছে। পরিকাঠামোর এই বেহাল দশা দ্রুত সংশোধন না হলে দেশের মেধা ও ভবিষ্যৎ বড় বিপদের সম্মুখীন হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।





