কলকাতা ময়দানে এক বর্ণময় এবং দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটল। ভারতীয় ফুটবল প্রশাসনের অন্যতম স্তম্ভ, প্রাক্তন মোহনবাগান সভাপতি তথা প্রখ্যাত ব্যবসায়ী স্বপনসাধন বসু, যিনি ক্রীড়ামহলে ‘টুটু বসু’ নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন, তিনি মঙ্গলবার গভীর রাতে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। তাঁর প্রয়াণে কেবল সবুজ-সুনামি শিবির নয়, সমগ্র ভারতীয় ফুটবল মহলেই এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।
শেষ মুহূর্তের লড়াই
গত কয়েকদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন টুটু বসু। সোমবার সন্ধ্যায় তাঁর শারীরিক অবস্থার আকস্মিক অবনতি ঘটলে তাঁকে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনা করে চিকিৎসকরা তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ময়দান জুড়ে উদ্বেগের ছায়া নেমে আসে। হাসপাতালের বিছানায় যখন তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করছিলেন, তখন তাঁকে দেখতে ছুটে যান কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক এবং সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের (AIFF) সভাপতি কল্যাণ চৌবে।
প্রশাসনিক তৎপরতা ও শোকের ছায়া
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী টুটু বসুর স্বাস্থ্যের নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। তাঁর সুচিকিৎসার জন্য একটি বিশেষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল গঠনের নির্দেশও দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন তাঁকে সুস্থ করে তোলার। কিন্তু মঙ্গলবার গভীর রাতে দ্বিতীয়বার হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি, এবং সেই ধাক্কা আর সামলানো সম্ভব হয়নি। মাঝরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ময়দানে আছড়ে পড়ে তাঁর চিরবিদায়ের বিষাদ সংবাদ।
মোহনবাগানের ‘মুশকিল আসান’
নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে টানা তিন দশক মোহনবাগান ক্লাবের প্রশাসনিক দায়িত্বে সরাসরি যুক্ত ছিলেন টুটু বসু। তিনি কেবল একজন সভাপতি বা প্রশাসক ছিলেন না, বরং ক্লাবের যে কোনও কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ ত্রাণকর্তা। ক্লাবের আর্থিক সংকট হোক বা প্রশাসনিক জটিলতা—সবক্ষেত্রেই তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল চূড়ান্ত এবং কার্যকর। তাঁর আমলেই মোহনবাগান ক্লাব আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছিল এবং সাফল্যের নতুন শিখরে পৌঁছেছিল। ময়দানে প্রচলিত ছিল যে, টুটু বসু মানেই সমস্যার সমাধান।
টুটু বসুর প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন প্রাক্তণ ফুটবলার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। তাঁর দেহ ক্লাবে নিয়ে আসা হলে সেখানে উপচে পড়ে অগণিত সমর্থকের ভিড়। চোখের জলে প্রিয় ‘টুটু দা’-কে বিদায় জানালেন মোহনবাগান ভক্তরা। তাঁর মৃত্যুতে ময়দানের এক যুগের অবসান হলো, যা হয়তো আর কখনও পূরণ হবে না।





