বাংলার প্রখর গ্রীষ্ম আর রেল ভ্রমণ—এক সময় এই দুইয়ের মেলবন্ধন ছিল সাধারণ যাত্রীদের কাছে বিভীষিকা। বিশেষ করে বয়জ্যেষ্ঠদের জন্য প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষা করা ছিল এক চরম ধৈর্যের পরীক্ষা। ৮৫ বছর বয়সী ললিতা ঘোষের অভিজ্ঞতাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। চিকিৎসার প্রয়োজনে প্রতি সপ্তাহে তাঁকে ৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। ললিতা দেবীর স্মৃতিতে এখনও টাটকা সেই দিনগুলো, যখন প্ল্যাটফর্মে পর্যাপ্ত পাখা, ঠান্ডা জল বা ছায়ার অভাবে বয়সের ভার দ্বিগুণ অনুভূত হতো। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আগে গরমের ভয়ে ট্রেন ভ্রমণে আতঙ্ক হতো। বসার জায়গা বা পর্যাপ্ত ছায়া ছিল না, দীর্ঘ প্রতীক্ষা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় থাকতাম।”
তবে ২০২৬-এর এপ্রিল মাস পূর্ব রেলওয়ের ইতিহাসে এক নতুন বিপ্লবের সাক্ষী হয়ে থাকল। ললিতা দেবী সম্প্রতি যখন প্ল্যাটফর্মে পা রাখলেন, রেলের বদলে যাওয়া পরিকাঠামো দেখে তিনি আপ্লুত। এই আমূল পরিবর্তন কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং পূর্ব রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার শ্রী মিলিন্দ দেউসকরের দূরদর্শী নেতৃত্বে পরিচালিত মাসব্যাপী এক বিশাল মিশনের ফসল। ক্রমবর্ধমান দাবদাহের হাত থেকে যাত্রীদের বাঁচাতে পূর্ব রেলওয়ে গত এক মাসে একগুচ্ছ অত্যাধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
যাত্রীদের তৃষ্ণা মেটাতে অঞ্চলজুড়ে ৭৮টি নতুন ওয়াটার কুলার স্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে শিয়ালদহে ৬টি, মালদহে ৬টি এবং আসানসোল বিভাগে একযোগে ৬৬টি কুলার বসানো হয়েছে। মালদহ বিভাগের রাজমহল স্টেশনে যাত্রীদের আরামের জন্য প্ল্যাটফর্মে চারটি নতুন এয়ার-সার্কুলেটিং ফ্যান লাগানো হয়েছে এবং জঙ্গিপুর রোড স্টেশনের এবিএসএস (ABSS) ভবনে পাঁচটি স্প্লিট এসি বসানো হয়েছে। এমনকি মুঙ্গের স্টেশনে পানীয় জলের সমস্যা মেটাতে নতুন ২ এইচপি সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। রাতের যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিয়ালদহ ও মালদহ বিভাগের ১০টি জনাকীর্ণ স্টেশনে আলোর মান উন্নত করা হয়েছে এবং বিভিন্ন ইয়ার্ডে সাতটি হাই-মাস্ট টাওয়ার চালু করা হয়েছে।
রেলওয়ের এই আধুনিকীকরণ শুধুমাত্র যাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, কর্মীদের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতেও নজর দেওয়া হয়েছে। শিয়ালদহ, হাওড়া, আসানসোলসহ বিভিন্ন ওয়ার্কশপে ২,৪৬১টি শক্তি-সাশ্রয়ী বিএলডিসি (BLDC) সিলিং ফ্যান বিতরণ করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো মজবুত করতে মালদহে ২৪টি এবং শিয়ালদহে ৯টি স্টার-রেটেড এসি লাগানো হয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনতে তালঝারি ও মুঙ্গেরে নতুন ট্রান্সফরমার এবং আসানসোলে এলটি প্যানেল বসানো হয়েছে। এমনকি প্রত্যন্ত জগদীশপুর বা বেলা হল্ট স্টেশনেরও বৈদ্যুতিকীকরণ সম্পন্ন হয়েছে। পূর্ব রেলের এই ‘ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন’ মিশন ললিতা দেবীর মতো লক্ষ লক্ষ মানুষের রেল সফরকে যন্ত্রণার বদলে এখন আরামদায়ক অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।





