মধ্যপ্রাচ্যের রণদামামা কি এবার সরাসরি আছড়ে পড়ল ভারতের হেঁশলে? পরিসংখ্যান কিন্তু সেই অশনি সংকেতই দিচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের তথ্য বলছে, দেশে রান্নার গ্যাসের (LPG) ব্যবহার এক ধাক্কায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমে গিয়েছে। ইজরায়েল-ইরান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালীতে তৈরি হওয়া অস্থিরতা ভারতের জ্বালানি সুরক্ষা ব্যবস্থাকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
সংকটের আসল রূপ: কী বলছে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক?
তেল মন্ত্রকের অধীনস্থ সংস্থা ‘পেট্রোলিয়াম প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যানালাইসিস সেল’ (PPAC)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছর মার্চের তুলনায় চলতি বছরের মার্চে এলপিজি-র ব্যবহার ১২.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে যেখানে দেশে ২.৭২৯ মিলিয়ন টন গ্যাস ব্যবহৃত হয়েছিল, এবার তা নেমে দাঁড়িয়েছে ২.৩৭৯ মিলিয়ন টনে। মূলত আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হওয়াতেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
কেন এই টালমাটাল পরিস্থিতি?
ভারতের মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশই আসে বিদেশ থেকে। যার সিংহভাগই পরিবাহিত হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান ও আমেরিকার মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার ফলে এই সরবরাহ পথ এখন কার্যত রুদ্ধপ্রায়। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে জাহাজ আসা অনিয়মিত হয়ে পড়ায় দেশজুড়ে বণ্টনে টান পড়েছে।
সরকারের ‘মাস্টারস্ট্রোক’ ও বাণিজ্যিক ধাক্কা
পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় সরকার সাধারণ মানুষের ঘরোয়া চাহিদাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আর তার মাশুল গুনতে হচ্ছে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রকে।
বাণিজ্যিক গ্যাস: হোটেল, রেস্তোরাঁ ও শিল্পক্ষেত্রে গ্যাসের জোগান কমানোর ফলে সেখানে ব্যবহার কমেছে প্রায় ৪৮ শতাংশ।
পাইকারি বিক্রি: পাইকারি বাজারে এলপিজি বিক্রি ৭৫.৫ শতাংশ কমে এক ঐতিহাসিক ধসের সাক্ষী থেকেছে।
ঘরোয়া সিলিন্ডার: সাধারণ মানুষের সিলিন্ডার বিক্রিতেও ৮.১ শতাংশ পতন দেখা গেছে, যা যথেষ্ট উদ্বেগজনক।
বিকল্প পথে সমাধান: দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি
বিদেশি আমদানিতে টান পড়তেই নড়েচড়ে বসেছে সরকার। দেশের অভ্যন্তরীণ রিফাইনারিগুলোকে পেট্রোকেমিক্যাল ফিডস্টক ব্যবহার করে দ্রুত এলপিজি উৎপাদনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মার্চ মাসে দেশীয় উৎপাদন বেড়ে ১.৪ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে। তবে ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় তা পর্যাপ্ত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।
পেট্রোল-ডিজেলে উল্টো ছবি
গ্যাসের ব্যবহারে ধস নামলেও, সড়ক পরিবহণের জ্বালানিতে কিন্তু গতি দেখা গেছে।
পেট্রোল: ৭.৬ শতাংশ বৃদ্ধি।
ডিজেল: ৮.১ শতাংশ বৃদ্ধি।
জেট ফুয়েল (ATF): বিমান বাতিল হওয়ার সংখ্যা বাড়ায় এর চাহিদা অপরিবর্তিত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞের রায়: অশনি সংকেত?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬-এর এই মার্চ মাস ভারতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। আমদানির ওপর অত্যাধিক নির্ভরতা যে কোনো মুহূর্তে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। সরকারের বর্তমান কৌশল হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য বিকল্প জ্বালানি ও নিজস্ব উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
যুদ্ধ থামবে কি না জানা নেই, তবে রান্নার গ্যাসের এই অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ চওড়া করছে। ভারত কি পারবে এই বিশ্বব্যাপী সংকট কাটিয়ে উঠতে? উত্তর লুকিয়ে আছে আগামী কয়েকমাসের সরকারি কৌশলে।





