বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণে আমূল বদল ঘটেছে। একশো আসনের নিচে নেমে এসে তৃণমূল কংগ্রেস এখন বিপর্যয়ের মুখে। এই হারের ক্ষত নিয়ে এবার দলের অন্দরের সমীকরণ ও ভুলত্রুটি নিয়ে মুখ খুললেন প্রবীণ তৃণমূল নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায়। একদা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী হিসেবে পরিচিত পার্থবাবু নিজের দলের বর্তমান পরিচালনার ধরণ নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।
পার্থ চট্টোপাধ্যায় স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন, দল এখন আর সেই পুরোনো পথে নেই। তাঁর মতে, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে যে পথে আমরা দল গড়েছিলাম, এখনকার নেতৃত্ব সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। বিজেপির রাজনৈতিক চাল ও কৌশল ধরতে আমরা চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছি। অযথা মানুষকে কালিমালিপ্ত করে নিজেরাই সাধু সাজতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের শিকার হয়েছি আমরা।” দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পার্থবাবুর গলায় শোনা গিয়েছে এক চরম বাস্তবতা—বিজেপি যদি ভুল না করে, তবে আগামীদিনে তৃণমূলের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
দলের বর্তমান নেতৃত্বের দিকে ইঙ্গিত করে পার্থবাবু ‘রাঁধুনি’ তত্ত্ব সামনে এনেছেন। তিনি বলেন, “দিদিই হলেন মূল রাঁধুনি। কিন্তু তাঁর আড়ালে যাঁরা সহ-রাঁধুনি হওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাঁরা সম্পূর্ণ ভিন্ন রেসিপি ব্যবহার করেছেন। পরামর্শদাতার (আইপ্যাক) ওপর অতিরিক্ত ভরসা এবং দল পরিচালনার ভিন্ন প্ল্যাটফর্মই আজকের জনবিচ্ছিন্নতার প্রধান কারণ।” সরাসরি আইপ্যাক (I-PAC)-এর সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই পরামর্শদাতারা এখন কোথায়?
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পার্থবাবু সুর কিছুটা নরম করলেও আইপ্যাককে বিঁধতে ছাড়েননি। তিনি বলেন, “অভিষেককে কেন একা দোষ দেওয়া হয়? আইপ্যাক আমাদের মাথা খেয়ে নিয়েছে। অভিষেক সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করার সাহস পায় কী করে তারা?” এরপরেই তিনি নিজের পরামর্শ দিয়ে বলেন, “আমি অভিষেককে বলব, নিজের ওপর জোর রাখুন। দিদি একা লড়েছেন, কিন্তু দল চালাতে একা জেতা যায় না। মা দুর্গার যদি দশ হাতের প্রয়োজন না হতো, তবে তিনি নিজেই সবটা পারতেন।”
পার্থবাবুর এই মন্তব্য তৃণমূলের অন্দরে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। টিকিট না পাওয়ার বেদনা এবং দলের সঙ্গে দূরত্ব সত্ত্বেও তিনি নিজেকে এখনও দলের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবেই দেখতে চান। তবে তাঁর এই ‘আত্মসমালোচনা’ আসলে দলের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের প্রতি এক তীব্র শ্লেষ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ভোটের এই বিপর্যয়ের পর ‘দেওয়ালের লেখা’ পড়ার যে সময় এসেছে, পার্থবাবু বারবার সেই সতর্কবার্তাই দিয়ে গিয়েছেন। আগামী দিনে দলের কোন পথে সংশোধন প্রয়োজন, তা নিয়ে তৃণমূল নেতৃত্বের ওপর চাপ বাড়ল এই বক্তব্যের মাধ্যমে।





