ভারত ও নেপালের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ‘রোটি-বেটি’র সম্পর্কে এবার বড়সড় ফাটল ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কাঠমান্ডু-জোগবানি সীমান্তে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলে আসা এক অনন্য এবং সস্তা যাতায়াত ব্যবস্থা হঠাৎ করেই থমকে গেছে নেপাল সরকারের একতরফা খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে। যার জেরে সীমান্ত এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতের বিহারের জোগবানি থেকে নেপালের রানি এলাকা পর্যন্ত প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যাত্রীদের নিয়ে যাতায়াত করতেন শয়ে শয়ে ভারতীয় রিকশাওয়ালারা। পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে দুই দেশের ছোট-বড় ব্যবসায়ী—সবাই এই সস্তা ও অত্যন্ত সুবিধাজনক যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু নেপালের কাঠমান্ডু মেট্রোপলিটন সিটির মেয়র বালেন শাহের নেতৃত্বাধীন সরকারি প্রশাসনের এক নয়া ফতোয়ায় রাতারাতি বদলে গেছে চেনা ছবিটা। এখন আর ভারতীয় রিকশাওয়ালাদের নেপালের ভূখণ্ডে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।
সবচেয়ে আশ্চর্যের এবং বৈষম্যের বিষয় হলো, নেপালি রিকশা, টোটো এবং অন্যান্য সমস্ত যানবাহন কিন্তু ভারতের সীমান্তে সম্পূর্ণ অবাধে ও কোনও বাধা ছাড়াই যাতায়াত করতে পারছে। নেপাল প্রশাসনের এই একচোখা ও একতরফা সিদ্ধান্তের ফলে সীমান্তে বসবাসকারী শত শত ভারতীয় রিকশাচালক ও তাঁদের পরিবারের জীবিকা এক লহমায় বিপন্ন হয়ে পড়েছে। উপার্জন হারিয়ে অসহায় চোখে সীমান্তের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন বহু মানুষ। এক ক্ষুব্ধ ভারতীয় রিকশাচালক নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “হঠাৎ করে রোজগার বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের সংসার চলবে কী করে? ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া, চিকিৎসার খরচ সবই তো এই রিকশার চাকার ওপর নির্ভর করত। আমাদের অপরাধটা কী?”
স্থানীয় ও বাণিজ্যিক সূত্রগুলি জানাচ্ছে, নেপালের এই বৈষম্যমূলক আচরণ শুধু রিকশাতেই সীমাবদ্ধ নেই। নেপাল সরকার খুব শীঘ্রই ভারতীয় যানবাহনের যাতায়াত রুখতে অনলাইন কাস্টমস সিস্টেম ও বিতর্কিত ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে। এর ফলে নেপালে যাওয়া ভারতীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে, যা প্রকারান্তরে ভারতীয়দের নেপালে যাওয়া কমাতেই করা হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ, নেপালি যানবাহন যখন ভারতে প্রবেশ করে, তখন ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনও জটিল বা একতরফা নিয়ম চাপানো হয় না। প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা “একতরফা শত্রুতা” এবং ক্ষমতার আস্ফালন হিসেবেই দেখছেন।
এই ঘটনার প্রভাব শুধু রিকশাচালকদের ওপরই পড়েনি, বরং ভারত-নেপাল সীমান্ত এলাকার ছোট ছোট দোকানদার, হোটেল ব্যবসায়ী এবং হকারদের ব্যবসাতেও বড়সড় ধস নেমেছে। পর্যটক ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় সীমান্ত অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি লাটে ওঠার জোগাড় হয়েছে।
কূটনৈতিক মহলেও এই ঘটনা নিয়ে ইতিমধ্যেই জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সস্তা জনপ্রিয়তার আলোয় আসতে এবং ভারত-বিরোধী মনোভাবকে উস্কে দিতেই মেয়র বালেন শাহের প্রশাসনকে দিয়ে এই ধরণের কাজ করানো হচ্ছে। এই উগ্র জাতীয়তাবাদী আবেগ সাময়িকভাবে নেপালের একাংশকে খুশি করতে পারলেও, দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের সাধারণ মানুষের শতাব্দীপ্রাচীন মধুর সম্পর্ককে চিরতরে ধ্বংস করে দেবে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখনও এই বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ও কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো না হলেও, বিহার সরকার এবং স্থানীয় সীমান্ত প্রশাসন গোটা পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের দাবি, ভারতের এবার উচিত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের খাতিরে ‘একতরফা ছাড়’ দেওয়ার নীতি বন্ধ করে নেপালি যানবাহনের ওপরেও একই ধরণের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা, যাতে জাতীয় স্বার্থ ও দেশের গরিব নাগরিকদের সম্মান রক্ষা পায়।





