“বুথ জ্যামিং, ছাপ্পা ভোট, রিগিং”-বাংলার ভোট লুটের ভয়ংকর ইতিহাস জানেন কি?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ‘ভোট’ আর ‘রিগিং’ যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দশকের পর দশক ধরে ক্ষমতার পালাবদল হলেও, ভোট লুটের অভিযোগ থেকে মুক্তি পায়নি বাংলা। বুধবার দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের আগে ফিরে দেখা যাক বাংলার নির্বাচনী ইতিহাসের সেই অন্ধকার দিনগুলো, যখন ভোট হওয়া মানেই ছিল সন্ত্রাস আর কারচুপির মহোৎসব।

রিগিংয়ের শুরু: ১৯৭২ থেকে ৩৪ বছরের ‘সায়েন্টিফিক’ জমানাস
বাংলার মানুষ ‘রিগিং’ শব্দটির সঙ্গে প্রথম পরিচিত হন ১৯৭২ সালের বিধানসভা ভোটে। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের জমানায় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রথম এই অভিযোগ ওঠে। তবে ১৯৭৭ সালে বামেরা ক্ষমতায় আসার পর এই ব্যবস্থাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাম জমানায় ভোট লুট কেবল গুণ্ডামিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা পৌঁছেছিল ‘শিল্পের’ পর্যায়ে— যার নাম দেওয়া হয় ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’।

কীভাবে চলত সেই ‘শিল্পকলা’?
বাম জমানায় প্রশাসনের এক শ্রেণির আধিকারিকরাই হয়ে উঠেছিলেন শাসকদলের আসল ‘অস্ত্র’। অভিযোগ অনুযায়ী:

তালিকা কারচুপি: ভোটার তালিকা তৈরির সময়ই শুরু হতো খেলা। বিরোধী সমর্থকদের নাম বাদ দেওয়া আর হাজার হাজার ভুয়ো ভোটার ঢোকানো ছিল জলভাত।

ভয়াল সন্ত্রাস: বিরোধী প্রার্থীদের বাড়িতে সাদা থান (বিধবার পোশাক) পাঠানো, ঘরছাড়া করা, একঘরে করে দেওয়া এমনকি ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার মতো ঘৃণ্য পন্থার অভিযোগও রয়েছে।

ব্যালট বক্স ও পুকুর কাণ্ড: ইভিএম আসার আগে জানলার ধারে ব্যালট বক্স রাখা হতো যাতে কর্মীরা দেখতে পারেন কে কাকে ভোট দিচ্ছেন। অনেক সময় ব্যালট পেপার গিলে ফেলা বা ভরা বাক্স পুকুরে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনাও ছিল নিত্যনৈমিত্তিক।

পাল্টাল জমানাও, পাল্টাল না ভোট নীতি?
২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ঘাসফুল শিবির ক্ষমতায় এলেও বিরোধীদের অভিযোগের তির থামেনি। অভিযোগ, বামেদের সেই পুরনো পথেই হাঁটছে তৃণমূলও। ইভিএম যুগেও রিগিংয়ের নতুন নতুন রূপ দেখা যায়:

ভূত ভোটার: আসল ভোটার অনুপস্থিত থাকলে তাঁর হয়ে অন্য কেউ বোতাম টিপে দিয়ে আসে।

এজেন্ট বিহীন বুথ: বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টদের বুথে বসতে না দেওয়া বা মেরে বের করে দেওয়া।

ভোটার দমন: ভোটের আগের রাতে এলাকায় বাইক বাহিনী নিয়ে তাণ্ডব চালিয়ে ভোটারদের বুথে যেতে বাধা দেওয়া।

২০২৬-এ কমিশনের নজিরবিহীন তৎপরতা
চলতি বিধানসভা নির্বাচনে অতীতের এই ‘কালো ছায়া’ মুছতে মরিয়া নির্বাচন কমিশন। রেকর্ড সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বুধবার দ্বিতীয় দফার ভোটে বুথ দখল বা রিগিং রুখতে পুলিশ ও প্রশাসনকে কড়া বার্তা দিয়েছে কমিশন। সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলেই নেওয়া হবে চরম ব্যবস্থা।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy